দল বদল বা দল থেকে কোনও বড় নেতাকে বহিষ্কার, দেশের রাজনীতিতে নতুন ঘটনা নয়। বহুজন সমাজ পার্টিতেও অতীতে ঘটেছে। কিন্তু পিসি ভাইপোকে দল থেকে বার করে দিচ্ছেন, এমন নজির বোধ হয় নেই অতীতে।
বহুজন সমাজ পার্টি (BSP)-র সুপ্রিমো মায়াবতী দল থেকেই বহিষ্কার করে দিলেন তাঁর ভাইপো আকাশ আনন্দকে। যে আকাশকে সকলে ভেবেছিল, মায়াবতীর পর ইনিই উত্তরসূরি, বহুজন সমাজ পার্টির সেকেন্ড ইন কম্যান্ড।
আকাশ আনন্দকে নিজে তৈরি করেছেন মায়াবতী। রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝানো থেকে শুরু করে দল নেতৃত্ব দেওয়ার কৌশল, ভাইপোকে শিখিয়েছেন তিনি।
মায়াবতীর ভাই আনন্দ কুমারের পুত্র আকাশ আনন্দকে ২০১৭ সালে রাজনৈতিক মঞ্চে প্রমোট করতে শুরু করেন মায়াবতী। আকাশের বয়স তখন ৩০।
২০১৯ সালের জুন মাসে বিএসপি-র ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ আকাশকে দেন মায়াবতী। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঘোষণা করে দেন, আকাশই তাঁর উত্তরসূরি।
আকাশের বিদায় ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল ২০২৪ সালের মে মাসেই। লোকসভা ভোটের প্রচারের সময় আকাশকে দলের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর পদ থেকে সরিয়ে দেন মায়াবতী। সীতাপুরে উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে আকাশের বিরুদ্ধে FIR দায়ের হয়। তখন আকাশকে উত্তরসূরি থেকেও বাতিল করে দেন মায়াবতী।
আকাশের ভাষণ দলের নীতি, আদর্শের বাইরে বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করে দেয়। পরিবারগত কারণে মায়াবতী ২০২৪ সালের অগাস্টে ফের আকাশকে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন।
আকাশ আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে শুরু করে। হরিয়ানা, জম্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড ও দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিএসপি-র প্রচারের গুরুদায়িত্ব দেন আকাশকে।
বহুজন সমাজ পার্টির বেশ কিছু নেতার বক্তব্য, মায়াবতী নাকি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে BSP-র প্রতিষ্ঠাতা কাঁসি রাম যখন মায়াবতীর নাম ঘোষণা করেন দলের উত্তরসূরি হিসেবে, তখন দায়িত্ব নিয়েই কাঁসি রামের ঘনিষ্ঠ নেতাদের দলে কোণঠাসা করে দিতে শুরু করে দেন মায়াবতী।
আরকে চৌধুরী, বলিহরি বাবু, রাম লক্ষ্মণ ভার্মা, জং বাহাদুর প্যাটেলের মতো নেতাদের সাইড করে দেন। ২০১২ সালে উত্তরপ্রদেশে যখন ক্ষমতাচ্যূত হল বিএসপি, তখন দলের যে সব নেতা তাঁর নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলেন, সবাইকে তাড়িয়ে দেন দল থেকে।
স্বামী প্রসাদ মৌর্য, দাদ্দু প্রসাদ, নাসিমুদ্দিন সিদ্দিকি, ইন্দ্রজিত্সরোজ, ব্রিজলাল খবরি, কমলাকান্ত গৌতম, ইশাম সি, হপাল সাইনি, দীনানাথ ভাস্করের মতো দুঁদে নেতাদের দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
এবার মায়াবতী দল থেকে ছেঁটে ফেললেন নিজের ভাইপোকেও। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও দিল্লিতে আকাশ ও তাঁর শ্বশুরমশাই অশোক সিদ্ধার্থকে মায়াবতী দায়িত্ব দিয়েছিলেন দলের প্রচার, তহবিল সংগ্রহ, রাজনৈতিক রণকৌশল নির্ণয় করার জন্য। মায়াবতীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিএসপি-র প্রবীণ নেতা রামজি গৌতমকে সাইডলাইন করে দেওয়া হয়।
দলের দুটি গোষ্ঠী তৈরি হয়ে যায়, একদল মায়াবতীর অনুগামী ও অন্য দল আকাশ আনন্দের অনুগামী। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে বিএসপি-র অত্যন্ত খারাপ রেজাল্টের পরে মায়াবতীর অনুগামীরা আকাশ আনন্দ ও তাঁর শ্বশুরশাই অশোক সিদ্ধার্থের ভূমিকা ও দলে অব্যবস্থা নিয়ে মায়াবতীকে নালিশ জানান।
এমনকী মায়াবতীকে অনেকে জানান, আকাশ ও অশোক সিদ্ধার্থ একাধিক রাজ্যে বিএসপি-র সংগঠন দখলের চেষ্টা করছেন।
আবার সেই ইনসিকিউরিটি ফ্যাক্টর। মায়াবতীর আশঙ্কা তৈরি হয়, দল ভেঙে যাবে। একদল তাঁর সমর্থনে থাকবে, আরেক দল আকাশের সমর্থনে থাকবে।
ফেব্রুয়ারিতে একটি সাক্ষাত্কারে মায়াবতী অশোক সিদ্ধার্থকে বিএসপি থেকে বহিষ্কারের কথা ঘোষণা করে দেন।
১৫ জানুয়ারি মায়াবতী জন্মদিনের উত্সবে আরেক ভাইপো আনন্দ কুমারের জন্য বিএসপি-র দরজা খুলে দেন। মায়াবতীর মনে হয়েছিল, আনন্দ কুমার তাঁর বিশ্বাসভাজন, তাঁর দলের সংগঠন দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। গত রবিবার মায়াবতী দলের একটি মিটিংয়ে বলেন, 'যে কোনও পেপারওয়ার্ক, আয়কর, আদালতের মামলা সব যাবতীয় দেখভাল করছে আনন্দ কুমার। সরকারি চাকরি ছেড়ে দলের কাজ করছে।' বিএসপি-তে যাতে তাঁর নেতৃত্বকে কেউ চ্যালেঞ্জনা করতে পারেন, তার জন্য মায়াবতী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন তিনি বেঁচে আছেন,কোনও উত্তরসূরি থাকবে না। দলের স্বার্থের জন্য কোনও সম্পর্কই গুরুত্বপূর্ণ নয়। দলে নিজের দখল আরও মজবুত করতে আনন্দ কুমার ও মায়বতীর ঘনিষ্ঠ নেতা রামজি গৌতমকে ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব দিয়েছেন।