
দীর্ঘ দিন ধরেই কিডনি-সহ একাধিক শারীরিক সমস্যার কারণে অসুস্থ ছিলেন মুকুল রায়। মাঝে মধ্যেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হত। কলকাতায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন রবিবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত উপসর্গ-সহ একাধিক জটিল অসুখে ভুগছিলেন। শেষ কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরেই ছিলেন তিনি। বর্ষীয়ান রাজনীতিক মুকুল রায়ের মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গ ও জাতীয় রাজনীতিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

তাঁর প্রয়াণে রাজনৈতিক মহলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মৃত্যুর খবর পেয়েই তাঁর বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। এদিন প্রথমে বিধানসভায় নিয়ে যাওয়া হবে মরদেহ। সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন বিধানসভার অধ্যক্ষ ও জনপ্রতিনিধিরা। পরে কাঁচরাপাড়ার বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে।

তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গিয়ে দল বদলের পরে গত ২০২১ সালে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন মুকুল রায়। জিতে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ফের তৃণমূলে যোগ দেন। তবে বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দেননি। ফলে তৃণমূলে যোগ দিলেও মুকুল রায় খাতায়কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল। তাঁর বিধায়কপদ খারিজের মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট খারিজের রায় দিলেও সেই সিদ্ধান্তের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।

কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন মুকুল রায়। তৃণমূল দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। এক সময়ে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। জাহাজ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলানোর পরে রেলমন্ত্রীর দায়িত্বও পান। তবে বর্তমানে রাজনীতির ময়দান থেকেও অনেক দূরে ছিলন মুকুল রায়।

মুকুল রায়ের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। বিজেপি রাজ্য সভাপতি পদে দিলীপের থাকার সময়েই মুকুল রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। দিলীপ জানিয়েছেন, বিজেপিতে থাকার সময় মুকুল রায়কে সম্মান জানানো হয়েছিল। শোকপ্রকাশ করেছেন সিপিএম (CPIM) নেতা সুজন চক্রবর্তী । শোকপ্রকাশ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ পার্থ ভৌমিক-ও।

বর্ণময় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। এক সময়ে তাঁকে ‘তৃণমূলের রাজনীতির চাণক্য’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। তবে, তাঁকে নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। ২০১৭ সালে, তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে (BJP) যোগ দিয়েছিলেন মুকুল রায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন মুকুল রায়। কিন্তু নির্বাচনের পর তিনি পুনরায় পুরনো দল তৃণমূলে ফিরে যান। এর পরেই দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের দাবিতে সরব হন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তবে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেননি মুকুল রায়।

তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এক্স পোস্টে লেখেন, 'মুকুল রায় প্রয়াত, চিরশান্তিতে থাকুক । দীর্ঘকাল চিনি । একটা সময়ে মমতাদির পরম অনুগত । দলের কঠিন সময়েও তৃণমূলভবন আগলে পড়ে থাকত । কর্মীদের সময় দিত । দিদির নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ ছিল । বাংলা চিনত । পরে সময়ের সঙ্গে বদল । আমার রাজনৈতিক উচ্চাশা ছিল না । তবু, রজ্জুতে সর্পভ্রম করে আমাকে বধ করার দরকার মনে করেছিল । আমার বিশ্বাসের মর্যাদা না দিয়ে আমাকে খাদের ধারে নিয়ে গিয়ে ঠেলে ফেলে দেওয়ার মূল কারিগর ছিল মুকুলদা । আমাকে, আমার ঘনিষ্ঠদের যা বলেছিল, ধ্রুবসত্য ধরেছিলাম । কঠিনতম দিনে ক্রমশ বুঝেছি রাজনীতির খেলা ...।'
মুকুল রায় প্রয়াত, চিরশান্তিতে থাকুক। দীর্ঘকাল চিনি। সাংবাদিক হিসেবে বা পরে রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে। একটা সময়ে মমতাদির পরম অনুগত। দলের কঠিন সময়েও তৃণমূলভবন আগলে পড়ে থাকত। কর্মীদের সময় দিত। দিদির নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ ছিল। বাংলা চিনত। পরে সময়ের সঙ্গে বদল। আমার রাজনৈতিক উচ্চাশা… pic.twitter.com/0NBCzfLnXI
— Kunal Ghosh (@KunalGhoshAgain) February 23, 2026

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, 'প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুকুল রায়-এর প্রয়াণের খবর পেয়ে গভীরভাবে মর্মাহত । তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আন্তরিক সমবেদনা । প্রার্থনা করি, তাঁর আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।'
Deeply disheartened to learn about the sad demise of Senior Politician; Shri Mukul Roy.
— Suvendu Adhikari (@SuvenduWB) February 23, 2026
My sincere condolences to his family. Praying that his soul attain eternal peace.
Om Shanti 🙏 pic.twitter.com/6mFdRz9VpF

প্রধানমন্ত্রী মোদীও শোকপ্রকাশ করেন। মোদী বাংলায় লেখেন, 'প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী মুকুল রায় জি'র প্রয়াণে শোকাহত। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাজসেবামূলক প্রচেষ্টা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানাই। ওঁ শান্তি।'
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী মুকুল রায় জি'র প্রয়াণে শোকাহত। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাজসেবামূলক প্রচেষ্টা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানাই। ওঁ শান্তি। pic.twitter.com/x3r6dR6kGy
— Narendra Modi (@narendramodi) February 23, 2026

মুকুল রায়ের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন, বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিদায়ের খবর আমাকে বেদনাহত করেছে।
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) February 23, 2026
প্রয়াত মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা-লগ্ন থেকে দলের জন্য প্রাণপাত…

শোক প্রকাশ করে ট্যুইট করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। যদিও কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অফিসিয়াল ভাবে তাঁর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করা হয়নি।
The demise of Mukul Roy marks the end of an era in Bengal’s political history. A veteran leader with vast experience. His contributions helped shape an important phase of the state’s public and political journey.
— Abhishek Banerjee (@abhishekaitc) February 23, 2026
As a founding pillar of the All India Trinamool Congress, he was…