
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে যেখানে এক ব্যক্তিকে হাতে কুড়ুল আরেকজন নির্মমভাবে কোপ দিতে দেখা যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে কয়েকজন মহিলাও সেদিকে ছুটে যাচ্ছেন।
ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে যে বাংলাদেশে গরুর জন্য কচুরিপানা কাটার কারণে মুসলিমরা তিনজন হিন্দুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। ভিডিও-সহ ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, "গরুর জন্য কচুরীপানা কাটার জন্য বাংলাদেশে এক পরিবারের 3 জন হিন্দুকে 3 জন মুস*লিম কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হ*ত্যা করলো...।"
কেউ আবার এই একই ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, "আবারো জিহাদির বাচ্চারা হিন্দু পরিবারকে কুপিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করল গাজীপুরে। গাজীপুর কালিগঞ্জ ৬ নং ওয়ার্ড চান্দায়া গ্রাম এ গঠনা গরুর জন্য কচুডি পানা কাটার জন্য একি পরিবারের তিন জন কে কুদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করে হিন্দুদের বাংলাদেশে থাকাটা খুবই মুশকিল হয়ে গেছে।"
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে এই ঘটনা কোনও মুসলিম পরিবার বা ব্যক্তির যোগ নেই। জমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিবাদের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই আরেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে কোপ দেন। এবং এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি আহত হলেও তাঁর মৃত্যু হয়নি।
যেভাবে জানা গেল সত্যি
এই ভিডিওটির স্ক্রিনশট রিভার্স ইমেজ সার্চ করে সবার প্রথম দৈনিক মুক্ত আলো কিশোরগঞ্জ নামের একটি ফেসবুক পেজে এই ভিডিওটি পাওয়া যায়। সেখানে লেখা হয় যে, একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। এ কথা সত্যি হলে আক্রমণকারী ও আক্রান্ত একই ধর্মের এই সম্ভাবনাই বেশি।
এই বিষয়ক কিওয়ার্ড সার্চ করে বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যম দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় যা গত ৩১ মার্চ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই খবরে লেখা হয়, গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চান্দাইয়া গ্রামে সম্পত্তি নিয়ে মামলার জেরে এক চাচতো ভাই আরেক চাচাতো ভাইকে কুড়ুল দিয়ে কোপানোর অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ মার্চ কালীগঞ্জে জমি সংক্রান্ত পূর্ব শত্রুতার জের ধরে রামচরণ ও তার ছেলে ঝন্টু দাস কুড়াল দিয়ে চাচাতো ভাই নারায়ণ, গিরিবালা ও হারাধন চন্দ্র দাসকে কোপান। রবিবার দুপুরবেলা নারায়ণ তার গরুর খাওয়ার জন্য বাড়ির পাশের পুকুরে কচুরিপানা কাটতে যান। এটা দেখে রামচরণ ও তার ছেলে লাঠি নিয়ে নারায়ণকে মারতে যান, পাশাপাশি রামচরণ কুড়াল নিয়ে নারায়ণকে এলোপাথাড়ি কোপ মারতে থাকেন।
এই আক্রমণে নারায়ণের স্ত্রী গিরিবালাও আহত হন। এরপর তাঁদের প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা শহরে স্থানান্তরিত করা হয়। এর থেকেই মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই হামলার ঘটনায় মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনও মানুষ জড়িত নয়।
সেই সঙ্গে এই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের সরকারি মিডিয়াভুক্ত পত্রিকা একুশে নিউজেও একটি খবর ছাপা হয়। সেখানে লেখা হয়, নারায়ণ চন্দ্র দাসের কন্যা লিপি রানী চন্দ্র দাসের বয়ান থেকে কালীগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এই খবরের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের ভ্যারিফায়েড পেজ থেকেও এই ঘটনাটির বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে পোস্ট করা হয় ৩১ মার্চ রাতে। সেখানে স্পষ্ট করে লেখা হয় যে এই ঘটনার পর লিপি রানী দাসের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবারের হামলাকারী সদস্য রামচরণ ও আরেক মহিলাকে আটক করেছে।
সকল তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে হিন্দু পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার জেরে ঘটনা হামলার ঘটনাকে মিথ্যে ও সাম্প্রদায়িক প্রলেপ দিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হচ্ছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দুরা গরুর জন্য কচুরিপানা কাটায় কীভাবে মুসলিমরা কুপিয়ে তিনজনকে হত্যা করেছে।
ভিডিওতে থাকা আক্রমণকারী ও আক্রান্ত, উভয়ই হিন্দু এবং একই পরিবারের সদস্য। পুরনো জমি বিবাদকে সূত্র ধরেই এই হামলা চালানো হয়।