
সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত ইফতার পার্টিতে আজান দেওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। আর এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আজান দেওয়ার ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। পাশাপাশি ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করা নিষিদ্ধ। কিন্তু ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থীরা সরস্বতী পুজো করতে দেয়না কিন্তু আজান দিয়ে ইফতার পার্টি করতে পারে.... হিন্দুদের প্রধান শত্রু হলো বামপন্থীরা.....।” (সব বানান অপরিবর্তিত)
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করতে দেওয়া হয় না সংক্রান্ত যে দাবি করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ইফতার পার্টির পাশাপাশি প্রতিবছর সরস্বতী পুজো, দোল এমনকি দুর্গাপুজোরও আয়োজন করা হয়।
কীভাবে জানা গেল সত্য?
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল কিনা সেই সংক্রান্ত কিওয়ার্ড সার্চ করলে ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার ডট কমে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে টিএমসিপি ও এবিভিপি উভয় ছাত্র সংগঠনের তরফে আলাদা আলাদাভাবে সরস্বতী পুজো আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়। এবং রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসুর তরফে তাদের অনুমতিও দেওয়া হয়। তবে কলকাতা হাইকোর্টের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ক্যাম্পাসে পুজোর অনুমতি দেওয়া হলেও বহিরাগতদের পুজো করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করতে না দেওয়ার দাবি সঠিক না হলেও হতে পারে।
এই সংক্রান্ত পরবর্তী সার্চ করলে ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এবিভিপি-র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সরস্বতী পুজো আয়োজনের একাধিক ছবি-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ ফেব্রুয়ারি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এবিভিপি-র তরফে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল। সেই পুজোতে মোট ১৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছিল এবং ৪০০ জন মানুষ খিচুড়ি প্রসাদ গ্রহণ করেছিলেন।
অন্যদিকে আমাদের সার্চে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ইউনিটের সভাপতি কিশলয় রায়ের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেখানে জেইউ-তে টিএমসিপি-র তরফে আয়োজিত সরস্বতী পুজোর একাধিক ছবি শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, "আজ, সকল ছাত্রছাত্রী এবং নেতৃত্বের সফল উদ্যোগে এবং উপস্থিতিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আয়োজন করেছিল সরস্বতী পুজো ২০২৫। ছাত্র ছাত্রীদের উৎসাহ এবং উদ্দীপনা পুজোকে কেন্দ্র করে আমাদের মন ছুঁয়ে গেছে। আগামিদিনেও আমরা একই ভাবে আপনাদের কাছে পৌঁছে যাবার চেষ্টা করব!”
এরপর আমরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সরস্বতী পুজো করা নিষিদ্ধ কিনা সেই তথ্য জানতে কিশলয় রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সরস্বতী পুজো করার উপরে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ইফতার পার্টির পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের তরফে প্রতিবছর সরস্বতী পুজো, দোল এমনকি দুর্গাপুজোরও আয়োজন করা হয়। যে বা যারা দাবি করছেন সরস্বতী পুজো করতে দেওয়া হয় না, তারা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে বদনাম করতে এই কথা বলছেন। আমরাই বিগত কয়েক বছর ধরে রেজিস্ট্রারের অনুমতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করে আসছি।”
তৃণমূল মুখপত্র তথা দলের সোশ্যাল মিডিয়া প্রধান দেবাংশু ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও আমাদের এই একই কথা বলেন। ২০২৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করতে চেয়ে টিএমসিপির তরফে কর্তৃপক্ষকে যে আবেদনপত্র দেওয়া হয়েছিল কিশালয় সেটি আমাদেরকে পাঠান। আমরা সেখানে সিল ও সই-সহ কর্তৃপক্ষের তরফে আবেদনপত্রটি গ্রহণের প্রমাণ দেখতে পায়।
পাশাপাশি ভাইরাল পোস্ট যেহেতু সরাসরি বামেদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সরস্বতী পুজো না করতে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তাই এরপর আমরা এসএফআই-এর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের পর্যবেক্ষক শুভদীপ চ্যাটার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “এসএফআই কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে সরস্বতী পুজো কিংবা ইফতার পার্টির আয়োজন করে না। তবে কেউ যদি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এই ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে চায় তাহলে তাতে আমাদের অতীতে কোনও অপত্তি ছিল না, বর্তমানেও নেই, এমনকি ভবিষ্যতেও থাকবে না। যারা দবি করছেন আমরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করতে দিই না, তারা কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই ধরনের কথা বলছেন। কারণ প্রতিবছরই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো আয়োজিত হয়।”
এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হলেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করা নিষিদ্ধ বলে যে দাবি করা হচ্ছে তা সঠিক নয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হলেও সরস্বতী পুজো করা নিষিদ্ধ।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করতে দেওয়া হয় না সংক্রান্ত যে দাবি করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ইফতার পার্টির পাশাপাশি প্রতিবছর সরস্বতী পুজো, দোল এমনকি দুর্গাপুজোরও আয়োজন করা হয়।