
লোকসভায় ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল পেশ হতে চলেছে। বিজেপি ইতিমধ্যেই এর জন্য মাঠ প্রস্তুত করেছে এবং এনডিএ জোটের সমস্ত দল, বিশেষ করে নীতীশ কুমার (জেডিইউ) এবং চন্দ্রবাবু নাইডু (টিডিপি) সরকারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। সংসদ সদস্যদের জন্য হুইপ জারি করা হয়েছে এবং সহযোগী দলগুলির পরামর্শ বিলের খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিরোধীদের কড়া অবস্থান
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। কংগ্রেস, আরজেডি, তৃণমূল কংগ্রেসসহ 'INDIA' জোটের দলগুলি এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করবে। দুপুর ১২টা থেকে লোকসভায় বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। মোট ৮ ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করা হয়েছে, যেখানে বিজেপি পাবে ৪ ঘণ্টা, এনডিএ ৪ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। প্রথম বক্তা হবেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, এরপর অমিত শাহ বক্তব্য রাখবেন।
এনডিএ-র শক্তিশালী অবস্থান
লোকসভায় ৫৪২ জন সদস্যের মধ্যে এনডিএ-র ২৯৩ জন সাংসদ রয়েছেন, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট। টিডিপি ও জেডিইউ-র সমর্থন নিশ্চিত হওয়ায় সরকার বিল পাস করাতে আত্মবিশ্বাসী। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই বিলকে 'সংবিধানবিরোধী' ও 'বিভেদ সৃষ্টিকারী' বলে অভিহিত করেছেন। কংগ্রেস, আরজেডি, তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলি বিলের কড়া বিরোধিতা করবে এবং এর বিরুদ্ধে ভোট দেবে।
রাজ্যসভায় পরবর্তী ধাপ
বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) রাজ্যসভায় বিল পেশ করা হবে। রাজ্যসভায় এনডিএ-র ১২৫ জন সাংসদ রয়েছেন, যেখানে ১১৮ ভোট পেলেই বিল পাস হবে।
ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৪ কী?
ওয়াকফ সংশোধনী বিল, ২০২৪ মূলত ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আনা হয়েছে। বিলের মাধ্যমে কিছু নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা ওয়াকফ বোর্ডের কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করতে সাহায্য করবে। এতে ওয়াকফ সম্পত্তির বেআইনি দখল ঠেকানো, অনিয়ম দূর করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিলের প্রধান বিষয়বস্তু
ওয়াকফ সম্পত্তির স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বেআইনি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ওয়াকফ বোর্ডের দায়িত্ব ও ক্ষমতা আরও সুসংহত করা হয়েছে।
সংসদের পরবর্তী ধাপে বিলটি আজ লোকসভায় পাস হলে বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় উত্থাপন করা হবে। সেখানে এনডিএ সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিরোধীদের প্রতিবাদ ও বিতর্ক আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ওয়াক্ফ সংশোধন বিল: ভ্রান্ত ধারণা ও বাস্তব সত্য
ওয়াক্ফ সংশোধন বিল নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে। আসুন, এসব ভ্রান্ত ধারণার আসল সত্য জানি।
মিথ: ওয়াক্ফ সম্পত্তি বাতিল হয়ে যাবে
সত্য: কোনও বৈধ ওয়াকফ সম্পত্তি বাতিল হবে না।
একবার ওয়াক্ফ হিসেবে ঘোষিত সম্পত্তি চিরকাল ওয়াক্ফ হিসেবেই থাকবে।
এই বিলের উদ্দেশ্য শুধু সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
জেলা প্রশাসক সেই সম্পত্তিগুলোর পর্যালোচনা করতে পারবেন, যেগুলো ভুলভাবে ওয়াক্ফ বলে দাবি করা হয়েছে, বিশেষ করে যদি সেগুলো সরকারি সম্পত্তি হয়।
মিথ: ওয়াক্ফ সম্পত্তির কোনো নতুন জরিপ হবে না
সত্য: জরিপ হবে, তবে নতুন নিয়মে।
আগের মতো ‘সার্ভে কমিশনার’ নয়, এবার জেলা প্রশাসক এই দায়িত্ব পালন করবেন।
রাজস্ব দফতরের মাধ্যমে জরিপ আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল হবে।
এই পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো প্রক্রিয়াটি আরও নির্ভরযোগ্য করা।
মিথ: ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে
সত্য: বোর্ডে অমুসলিম সদস্য থাকবে, তবে তারা সংখ্যালঘু থাকবে।
নতুন নিয়মে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ওয়াক্ফ বোর্ডে কমপক্ষে দুইজন অমুসলিম সদস্য রাখতে হবে।
বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য এখনও মুসলিমদের থেকেই থাকবেন।
এর মূল উদ্দেশ্য বোর্ডের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিশ্চিত করা।
মিথ: মুসলমানদের ব্যক্তিগত জমি অধিগ্রহণ করা হবে
সত্য: ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
বিলটি শুধুমাত্র ওয়াক্ফ ঘোষিত সম্পত্তির জন্য প্রযোজ্য।
কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি যদি ওয়াক্ফ হিসেবে নিবন্ধিত না হয়, তবে তা এই আইনের আওতায় পড়বে না।
মিথ: সরকার এই বিলের মাধ্যমে ওয়াক্ফ সম্পত্তি দখল করবে
সত্য: সরকার শুধু ভুলভাবে ওয়াক্ফ ঘোষিত সম্পত্তির পর্যালোচনা করতে পারবে।
যদি কোনও সম্পত্তি ভুলভাবে ওয়াক্ফ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তবে জেলা প্রশাসক তা যাচাই করবেন।
তবে, বৈধ ওয়াক্ফ সম্পত্তি সরকার কোনোভাবেই দখল করতে পারবে না।
মিথ: অমুসলিমরা মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ পাবে
সত্য: অমুসলিম সদস্যদের রাখা হয়েছে কেবল পরামর্শক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে।
মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তির মূল নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতেই থাকবে।
নতুন নিয়মের লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতা ও দক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করা।
মিথ: মসজিদ, দরগাহ, কবরস্থান ইত্যাদির ঐতিহ্য নষ্ট হবে
সত্য: এই বিল ধর্মীয় স্থাপনার ঐতিহ্য বা ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন আনবে না।
শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করতে এই সংশোধন আনা হয়েছে। ধর্মীয় স্থানের কার্যক্রম আগের মতোই চলবে।
মিথ: এই বিল মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার খর্ব করবে
সত্য: এই বিলের উদ্দেশ্য সুশাসন নিশ্চিত করা, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা নয়।
নতুন নিয়মে ওয়াক্ফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ হবে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বত্ব ও ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
ওয়াক্ফ বোর্ডে সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা
এই সংশোধনীর মাধ্যমে শিয়া, সুন্নি, বোহরা, আঘাখানি ও পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের অন্তত একজন সদস্য বোর্ডে থাকতে হবে, যাতে সব শ্রেণির ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।