ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৪ লোকসভায় পেশ হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার বিলটিকে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে দাবি করলেও বিরোধীরা এটিকে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তির উপর হস্তক্ষেপ বলে অভিযোগ করছে। মঙ্গলবার লোকসভায় কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিলটি পেশ করেন। এতে মূলত জেলা প্রশাসনকে ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আগে ওয়াকফ বোর্ডই এসব বিষয় দেখভাল করত, কিন্তু নতুন বিধি অনুসারে জেলা প্রশাসক ওয়াকফ সম্পত্তির স্বীকৃতি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারবেন। বিরোধীদের দাবি, এর মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পত্তির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। এনডিএ জোট বিলের পক্ষে একজোট হলেও বিরোধী শিবির তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। কংগ্রেস, আরজেডি, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলি দাবি করছে, এটি সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও সম্পত্তির অধিকার খর্ব করতে পারে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও জমিয়ত উলেমা-এ-হিন্দও বিলের বিরোধিতা করেছে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, বিলটি ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা আনবে এবং বেআইনি দখলদারি রোধ করবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এটি ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের পথ খুলে দিতে পারে। আগামী বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় বিলটি উঠবে। সেখানেও উত্তপ্ত বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে। বিল পাশ হলে এটি সংখ্যালঘু সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অমিত শাহ বলেন, 'যখন সিএএ আইন আনা হয়েছিল, বিরোধীরা বলেছিল, এটা মুসলিমবিরোধী। তারপর যদি একজন মুসলিমও নাগরিকত্ব হারান, দয়া করে আমাদের জানান। বিভ্রান্ত হবেন না।'
ওয়াকফ নিয়ে তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়কে আক্রমণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। সৌগত রায়কে নিশানা করে বলেন, "দাদার টেনশন বুঝি বাংলার মুসলমানরাও তো আজ শুনছেন। তাই তাঁর টেনশন হওয়াটাই স্বাভাবিক।"
'ওয়াকফ নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। এই হাউসের মাধ্যমে আমি সমগ্র দেশের মুসলিম ভাইদের বলতে চাই যে, একজন অমুসলিমও তোমাদের ওয়াকফের মধ্যে আসবে না।'
সরকারি সম্পত্তি দান করা যায় না। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানো হচ্ছে: অমিত শাহ।
মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের জন্য ওয়াকফ বিল নিয়ে বিরোধিতা করছে বিরোধীরা, বললেন অমিত শাহ।
ওয়াকফ মুসলিমদের নেরুদণ্ড। আর তা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। লোকসভায় বললেন তৃণমূল নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, 'এই বিল সংবিধানের বিরুদ্ধে। সাংবিধানিক কাঠামোর উপর আক্রমণ। আমরা এই বিলের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি। বিজেপি ওয়াকফ নিয়ে রাজনীতি করছে। ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের মেরুদণ্ড। ওয়াকফ সংশোধনী বিলে যে পরিবর্তনগুলি করা হচ্ছে তা ইসলামী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।'
এই ওয়াকফ বিল অসাংবিধানিক। সংবিধানের কাঠামোকে অঘাত করে এই বিল। হিন্দু ল ইংরেজ ল কে মানে। কিন্তু মুসলিম ল সম্পূর্ণ অন্য। মুসলিম ল অনুসারে ওই সম্পত্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই সেখানে অন্য কারও হাত দেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না।
ওয়াকফ বিলের প্রসঙ্গে নোটবন্দির প্রসঙ্গ তুললেন উত্তরপ্রদেশের লোকসভার সাংসদ অখিলেশ যাদব। তিনি বলেন, 'নোটবন্দির কারণে এখনও মানুষ ভুগছে। কর্মসংস্থান কমেছে। সেজন্য নোটবন্দি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। গঙ্গা পরিষ্কারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, তার কী হল? অনেক গ্রাম দত্তক নেওয়া হয়েছিল, তার পরিণাম কী, এগুলো দেশের মানুষের জানা দরকার।'
'ওয়াকফের 8 লক্ষ সম্পত্তি আছে', রবিশঙ্কর প্রসাদ লোকসভাকে বললেন। 'ওয়াকফ সম্পত্তির উপর জনস্বার্থে কতটা কাজ করা হয়েছে', লোকসভায় প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিজেপি সাংসদ রবিশঙ্কর প্রসাদ বললেন, আমি শুনেছি, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়মও ওয়াকফ বোর্ডের সম্পত্তি। আপনারা কি চান না ওয়াকফ বোর্ডের সুবিধা গরিবরা পাবেন না?
বুধবার লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন বিজেপি নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ। তিনি বিরোধীদের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, 'একদিকে বলছে সংশোধন দরকার, আবার বলছে দরকার নেই—দুই বিপরীত মত কীভাবে একসঙ্গে সম্ভব?' তিনি সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারা উল্লেখ করে বলেন, 'এই ধারা স্পষ্ট বলছে যে নারীদের সঙ্গে বৈষম্য করা যাবে না এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণির উন্নয়নে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। এই বিলের মাধ্যমে যদি পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আপত্তির কারণ কী?' রবিশঙ্কর প্রসাদ আরও বলেন, 'সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যদি ওয়াকফের জমি লুটপাট হয় বা দখল হয়ে যায়, তবে আইন আনার অধিকার সরকারের রয়েছে। তাই এই বিল সংবিধানবিরোধী নয়।'
"সংবিধানের ডাকে সাড়া দিচ্ছি সংবিধান দিয়েই। সংবিধানের ১৫ ধারায় এর বিধান রয়েছে। ২৫ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। আমার সাথে এর বিভাগ দু'টিও পড়ুন। যদি ওয়াকফ জমি নষ্ট হয়, লুট করা হয় বা দখল করা হয়, তাহলে সংবিধানের ২৫ ধারা আইন তৈরি করার অধিকার দেয়। এই বিল কোনওভাবেই অসাংবিধানিক নয়," বললেন রবিশঙ্কর প্রসাদ।
'এই সরকারে সংখ্যালঘুদের অবস্থা খারাপ', লোকসভায় বললেন কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ।
লোকসভার বিরোধী শিবিরের উপনেতা গৌরব গগৈ অভিযোগ করেছেন যে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ইউপিএ সরকার সম্পর্কে যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
আপনাদের কতজন সাংসদ মুসলিম, আগে সেই প্রশ্নের জবাব দিন। তারপর ওয়াকফ সংশোধনী বিল আনবেন। কিরেন রিজিজু যা যা বললেন, পুরোটাই বিভ্রান্তিকর। কেন্দ্রকে পাল্টা নিশানা করলেন কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ।
এটি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত একটি বিষয়। তিনি আরও বলেন, "যেখানে বিরোধ আছে সেখানে ওয়াকফ সম্পত্তির বিষয়ে আদালতের ক্ষমতা কীভাবে নিতে পারি। এমনকি যখন সিএএ আনা হয়েছিল, এরা বলেছিল যে মুসলমানদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বলুন তো, কোন মুসলমানের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে? আজকে আবার বিভ্রান্ত হলে এর মাশুল দিতে হবে। তারপর তারা আবার কিছু বিল নিয়ে আসবে এবং আপনাকে প্রকাশ করবে। আপনি ওয়াকফ তৈরি করতে পারেন কিন্তু নারী ও শিশুদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবেন না। এটি একটি বড় সংস্কার।"
'ওয়াকফ নিয়ে বারবার বলা হচ্ছে, অমুসলিম কেন মুসলিমদের বিষয়ে বলছেন? কিন্তু এই ভাবনা একেবারেই ঠিক নয়। এই সংশোধনীর সঙ্গে ধর্মীয় ব্যবস্থার কোনও সম্পর্ক নেই। এটি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত একটি বিষয়। যেখানে বিরোধ আছে সেখানে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে আমরা কীভাবে আদালতের ক্ষমতা নিতে পারি।' বললেন কিরেন রিজিজু।
‘ওয়াকফ বিল কারও সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার আইন নয়’, লোকসভায় বললেন রিজিজু।
রিজিজু বলেন, 'আমরা যা কিছু পরিবর্তন করেছি তাতে ওয়াকফ সম্পত্তির আরও ভাল ব্যবহার করার জন্য কী করা উচিত, আমরা আপনাদের পরামর্শগুলিকে স্বাগত জানাব। যাঁরা এই বিলের বিরোধিতা করেছেন তাঁদের শতাব্দীর পর শতাব্দী মনে রাখবেন সকলে।'
বুধবার লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। বিরোধীদের তীব্র আপত্তির মধ্যেই তিনি কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। রিজিজু বলেন, 'যদি ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় না আসত, তাহলে সংসদ ভবন ও বিমানবন্দরের জমিও ওয়াকফের হাতে তুলে দেওয়া হতো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদ দখল ঠেকিয়েছেন।' বিরোধী দলগুলি বিলটির বিরোধিতা করে তুমুল স্লোগান দিতে থাকে। তবে রিজিজু দাবি করেন, 'কংগ্রেস আমলে ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান সরকার সংশোধন করছে।'