Islamic NATO and India Factor: ইসলামিক NATO থেকে দূরে থাকছে একটি মুসলিম দেশ, ভারতের জন্যই? যা জানা জরুরি

১৯৫৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সুয়েজ খাল দখলের লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। ইজরায়েলি বাহিনী সিনাই উপদ্বীপে ঢুকে পড়ে, তখন ভারত এই অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ-ইজরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে সুয়েজ খালের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মিশরের অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছিল দিল্লি।

Advertisement
ইসলামিক NATO থেকে দূরে থাকছে একটি মুসলিম দেশ, ভারতের জন্যই? যা জানা জরুরি  প্রধানমন্ত্রী মোদী ও মিশরের বিদেশমন্ত্রীর বৈঠক ও ইসলামিক ন্যাটো
হাইলাইটস
  • ভারত ও মিশর একদা একদা একে অপরকে সাহায্য করেছিল
  • আজও ভারত ও মিশরের সম্পর্ক যথেষ্ট শক্তিশালী
  • মিশর কি ইসলামিক NATO-তে যোগ দেবে?

ইরান যুদ্ধের আবহে মুসলিম NATO নিয়ে জোর চর্চা চলছে বিশ্বে। কারও দাবি, এই জোট গড়ার নেপথ্যে আসলে রয়েছে আমেরিকার হাত। ইরানকে চাপে রাখার কৌশল। কারও আবার দাবি, প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের হামলা রুখতে ও ইসলাম সম্প্রদায়ের মানুষকে রক্ষা করতেই ইসলামিক NATO তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু তাত্‍পর্ণ বিষয় হল, আপাদমস্তক মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইসলামিক ন্যাটো থেকে এখনও নিজেদের দূরে রেখেছে মিশর। কেন মিশর নিজেদের এই জোট থেকে সরিয়ে রাখছে? এখানে কিন্তু কাজ করছে ভারত ফ্যাক্টর।

ভারত ও মিশর একদা একদা একে অপরকে সাহায্য করেছিল

একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। ১৯৫৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সুয়েজ খাল দখলের লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। ইজরায়েলি বাহিনী সিনাই উপদ্বীপে ঢুকে পড়ে, তখন ভারত এই অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ-ইজরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে সুয়েজ খালের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মিশরের অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছিল দিল্লি। এর ঠিক ৫ বছর পর, ১৯৬১ সালে গোয়া পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করতে ভারতীয় সেনা অভিযান শুরু করে। সেই সময় মিশরও ভারতের পাশে দাঁড়ায়। গোয়ার দিকে পর্তুগিজ বাহিনীর জন্য পাঠানো অতিরিক্ত সেনা ও সামরিক সাহায্য যাতে সুয়েজ খাল দিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করেছিল মিশর।

আজও ভারত ও মিশরের সম্পর্ক যথেষ্ট শক্তিশালী

এই দুই কারণকে যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাচ্ছে দিল্লি ও কায়রোর গাঢ় বন্ধুত্ব বহু দশকের। দুই দেশই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। স্বাধীন হওয়ার পরে ভারত ও মিশর গড়ে তুলেছিল জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা Non-Aligned Movement (NAM)-এর অন্যতম ভিত্তি। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় আমেরিকা বা সোভিয়েত ইউনিয়ন, কোনও পক্ষের সঙ্গেই সরাসরি জোটে না গিয়ে স্বাধীন বিদেশনীতি বজায় রাখাই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। আজও ভারত ও মিশরের সম্পর্ক যথেষ্ট শক্তিশালী। বিশেষ করে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। এই দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কই সম্ভবত মিশরের মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধার অন্যতম কারণ।

Advertisement

ভারত ও মিশরের যৌথ সামরিক মহড়া - রয়টার্স
ভারত ও মিশরের যৌথ সামরিক মহড়া - রয়টার্স

মিশর কি ইসলামিক NATO-তে যোগ দেবে?

মক্কায় যে সামরিক চুক্তি হয়েছে গত ৭ অগাস্ট, যাকে ইসলামিক NATO বলা হচ্ছে, এই চুক্তিতে রয়েছে তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব। এই চুক্তিকে কার্যকর করার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রয়েছে পাকিস্তানের। অন্যদিকে আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর দেশ মিশরকে এই ইসলামিক NATO-র পরবর্তী সদস্য দেশ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এছাড়াও সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে যোগ দিতে পারে কাতার, কুয়েত, জর্ডন, আজারবাইজান ও সিরিয়া। তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হেকেন ফিডেনের দাবি, কায়রো নিউট্রাল পার্টনার। মিশরের যোগদানের ক্ষেত্রে কিছু টেকনিক্যাল ইস্যু চলছে, সেগুলি মিটলেই মিশরও এই চুক্তিতে সই করবে।

মক্কা চুক্তিতে সদস্যভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানরা - রয়টার্স
মক্কা চুক্তিতে সদস্যভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানরা - রয়টার্স

আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী মিশরের

মিশর যদি মক্কা চুক্তিতে সই করে, তাহলে কিন্তু ইসলামিক NATO অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে যাবে। কারণ মিশরের কাছে রয়েছে সাড়ে ৪ লক্ষ মিলিটারি, কয়েকশো অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান। সঙ্গে সামরিক ক্ষেত্রে আমেরিকার সাহায্যও পায় এই দেশ। মিশরসুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণ করে। আর সুয়েজ খাল আবার ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সামরিক আদানপ্রদানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। ঠিক যেমন, হরমুজ প্রণালী তেলবাহী জাহাজের যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 

মিশরের বিদেশমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির দাবি, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে গত সপ্তাহে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে কায়রো। মিশরের যোগদানের আগে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে, তা নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনি পর্যালোচনা এখনও বাকি রয়েছে। তবে মিশরকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সৌদি আরবের আপত্তি রয়েছে। পাশাপাশি ভারত-সহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না কায়রো। এই দুই কারণেই আপাতত মিশরকে সদস্য হিসেবে পাচ্ছে না ‘ইসলামিক ন্যাটো’।

সৌদি আরব কেন মিশরকে ইসলামিক NATO-তে চাইছে না?

বহু প্রাচীনকাল থেকেই ভারত ও মিশরের মধ্যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদানপ্রদান। প্রাচীন মিশরের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার গভীর যোগ রয়েছে। সেই আদানপ্রদান ও বন্ধুত্ব আজও অটুট। ২০২৩ সালে ভারত ও মিশরের সম্পর্ক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ পর্যায়ে উন্নীত হয়। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও কায়রো ও নয়াদিল্লির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের সামরিক বাহিনী নিয়মিত যৌথ মহড়াতেও অংশ নেয়। মিশরে প্রায় ৭০০টি ভারতীয় সংস্থা নথিভুক্ত রয়েছে। 

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রপ্রধানদের আড্ডা - রয়টার্স
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রপ্রধানদের আড্ডা - রয়টার্স

সৌদি আরব কেন মিশরকে মক্কা চুক্তিতে চাইছে না?

তাত্‍পর্যপূর্ণ ভাবে তুরস্ক চাইছে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিক মিশর। কিন্তু সৌদি আরব চাইছে না। বস্তুত, মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ এখনই মিশরকে ইসলামিক ন্যাটো-তে অংশীদার করতে রাজি নয়।  মিশরকে নিয়ে সৌদি আরবের এই অবস্থানের পিছনে মূলত প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ কাজ করছে। রিয়াধের ধারণা, একসময় মিশর যে ধরনের কৌশলগত ও সামরিক গুরুত্ব বহন করত, বর্তমানে সেই গুরুত্ব আর নেই। 'মিডল-ইস্ট আই' সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, মিশরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের জেরেই সৌদি আরব মক্কা চুক্তিতে কায়রোর যোগদানের বিরোধিতা করেছে। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর্থিক ভাবে শক্তিশালী করতে সৌদি আরব প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। তবে বিনিময়ে মিশরের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পায়নি সৌদি আরব।

আবার মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী জোট UAE বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরব আবার স্ট্র্যাটেজিক, অর্থনৈতিক ও বিদেশনীতির ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। সৌদি আরবের এক প্রাক্তন সরকারি আধিকারিকের দাবি, মিশর সর্বদা সৌদি আরব ও আমেরিকার উপর নির্ভরশীল, কিন্তু বদলে তারা কিছুই দেয় না। শুধুই নেয়। 

POST A COMMENT
Advertisement