ট্রাম্পের বিপর্যয়, এবার পাশা ঘুরবে দিল্লির?মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ক্ষমতা দখল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে – এই ফলাফলের প্রভাব ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের ওপরই পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের জন্য, দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্পের শুল্ক ও অভিবাসন নীতির ওপর আরও বেশি নজরদারি এবং সম্ভবত একটি অনুকূল বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য, এই পরিবর্তন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে তাদের করা ক্রিপ্টো ও প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর ওপর অস্বস্তিকর নজরদারি নিয়ে আসতে পারে ।
যদিও ট্রাম্প ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন,তবে তিনি আর নিজের ইচ্ছেমতো আইন পাস করাতে বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দুই বছরে তাঁকে আরও প্রতিকূল কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ট্রাম্পের বিদেশনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়েও তদন্ত করবে। তবে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশ ভিন্ন হতে পারে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল: এটি ভারতকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে?
এই শোচনীয় পরাজয়ের পর, ট্রাম্প তার সমর্থকদের কাছে শক্তি প্রদর্শনের জন্য একটি বড় বৈদেশিক নীতির বিজয় অর্জনে উদগ্রীব থাকবেন। ভারতের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি তার কর্মসূচির শীর্ষে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত সম্ভবত মধ্যবর্তী ফলাফলকে একটি অনুকূল চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ হিসেবে দেখবে, যা নিয়ে কয়েক মাস ধরে অচলাবস্থা চলছে। বিশেষ করে ভারত ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করছে যতক্ষণ না এই আশ্বাস পাওয়া যায় যে তারা চিন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের চেয়ে ভালো শুল্ক সুবিধা পাবে।
এর পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার অধীনে ভারত ও অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, এটা নির্ধারণ করার জন্য যে তারা মার্কিন অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে কৌশলগত অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করছে কি না। এই বিষয়গুলো বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন, দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্প হয়তো ভারতকে কিছুটা স্বস্তির সুযোগ দেবেন এবং চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়ো করতে চাপও কমতে পারে। তবে, এর অপর দিকে, এটি যে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পথকে সহজ করে তুলবে,তেমনটাও কিন্তু নয়। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, ট্রাম্প শুল্ক আরোপের জন্য তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে পারেন। ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করতে পারে না।
H-1B ভিসা: ভারত কি কিছুটা স্বস্তি আশা করতে পারে?
আরেকটি ক্ষেত্র যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা হলো অভিবাসন। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ওপর, বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির ওপর ট্রাম্পের কঠোর পদক্ষেপ, ভারতীয় পেশাজীবী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন শুধু এইচ-১বি ভিসার জন্য ১,০০,০০০ মার্কিন ডলারের কঠোর ফি আরোপ করেছে তাই নয়, বরং যেসব সংস্থা আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করছে, তাদের এইচ-১বি ভিসার আবেদনপত্রগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এই দুটি পদক্ষেপই পরোক্ষভাবে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের প্রভাবিত করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অনুমোদিত প্রতি চারটি এইচ-১বি ভিসার মধ্যে প্রায় তিনটিই ভারতীয় নাগরিকদের হয়ে থাকে, যা তাদেরকে আমেরিকার প্রযুক্তি খাতের মেরুদণ্ডে পরিণত করেছে। বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের এইচ-১বি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। যেহেতু ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে চলেছে, তাই বিষয়টি নিয়ে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও স্বল্পমেয়াদে কোনও স্বস্তি নাও মিলতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের জন্য সুসংবাদ বয়ে আনতে পারে।
তবে, ভারতের জন্য সবকিছু হয়তো অনুকূল নয়। ঐতিহাসিকভাবেই ডেমোক্র্যাটরা ভারতের মানবাধিকার রেকর্ডের সমালোচক। ডেমোক্র্যাটরা ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবস্থা এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আচরণের ওপর আরও নিবিড়ভাবে নজর দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বলাই যায় মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের জন্য, রিপাবলিকানদের এই শোচনীয় পরাজয় প্রতিকূল শর্ত মেনে নিতে বাধ্য না হয়েই ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার আরও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে, এটি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের উত্তাল অধ্যায়ের অবসান নাও ঘটাতে পারে। পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের কারণ হলো, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে তাদের গড়ে তোলা ব্যবসায়িক সম্পর্কগুলো মার্কিন কংগ্রেসের তদন্তের আওতায় আসার সম্ভাবনা।