Nepal : ভারতের ভূখণ্ড নিজেদের বলে দাবি নেপালের, অথচ চুক্তির নথিই খুঁজে পাচ্ছে না সরকার

নেপালের হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য রাখেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তিনি স্বীকার করেন, সরকার নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির সরকারি মূল নথি নেপালের কাছে রয়েছে কি না।

Advertisement
ভারতের ভূখণ্ড নিজেদের বলে দাবি নেপালের, অথচ চুক্তির নথিই খুঁজে পাচ্ছে না সরকারচুক্তি খুঁজে পাচ্ছে নেপাল সরকার
হাইলাইটস
  • সুগৌলি চুক্তির মূল নথি খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়
  • ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির আসল কপিও নেপাল বহু বছর ধরে খুঁজে আসছে

ভারতের কয়েকটি জায়গা নিজেদের বলে দাবি করে থাকে নেপাল। অথচ যে চুক্তিতে তা উল্লেখ বলে তারা দাবি করে থাকে সেটাই খুঁজে পাচ্ছে না সরকার। নেপাল সীমান্ত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২১০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক সুগৌলি চুক্তি। সেই চুক্তিই ভারত ও নেপালের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু নেপালের কাছে তার নথি আদৌ রয়েছে কি না সেটাই বলতে পারছে না বালেন শাহর মন্ত্রিসভা।

এই নিয়ে সংসদে বিবৃতিও দিয়েছে নেপাল সরকার। তাদের তরফে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন আর্কাইভ, সরকারি দফতর, গ্রন্থাগার এবং সংগ্রহশালা খুঁজেও চুক্তির মূল নথি খুঁজে পায়নি। এদিকে এই তথ্য সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ভারত-নেপাল সীমান্ত বিবাদ নিয়ে। বিশেষ করে লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরাকে ঘিরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধে সুগৌলি চুক্তির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ, ১৮১৬ সালের ওই চুক্তিতেই কালী বা মহাকালী নদীকে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কোথায় সুগৌলি চুক্তির আসল নথি?

নেপালের হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য রাখেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তিনি স্বীকার করেন, সরকার নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির সরকারি মূল নথি নেপালের কাছে রয়েছে কি না। সংসদে তিনি বলেন, সরকারের কাছে সরকারি চুক্তির নথি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। জাতীয় আর্কাইভে বিভিন্ন চুক্তি সংক্রান্ত কিছু নথি সংরক্ষিত রয়েছে বলে রেকর্ডে উল্লেখ আছে। কিন্তু সেই নথিগুলিই যে সংশ্লিষ্ট চুক্তির আসল সরকারি কপি, তা নিশ্চিত নয়।

তবে নেপালের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি এবং ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি—দুই চুক্তিরই নথি নেপালের কাছে রয়েছে। কিন্তু সেই নথিগুলি মূল নথি কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শুধু সুগৌলি নয়, ১৯৫০ সালের চুক্তির মূল কপিও অধরা

Advertisement

সুগৌলি চুক্তির মূল নথি খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির আসল কপিও নেপাল বহু বছর ধরে খুঁজে আসছে। ২০১৬ সালে ভারত-নেপাল সম্পর্ক নিয়ে তৈরি Eminent Persons' Group বা EPG যখন ১৯৫০ সালের চুক্তি পর্যালোচনা অথবা নতুন করে চুক্তি করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করে, তখন নেপালের পক্ষ থেকে চুক্তিটির মূল কপি খোঁজার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেই অনুসন্ধানেও মূল কপি পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ভেক বাহাদুর থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে নেপাল একটি দ্বিতীয় কপি সরবরাহ করে।

এরপর অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত হয়। নেপালের সংসদীয় তদন্তে দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি, আর্কাইভ এবং সরকারি নথি সংরক্ষণাগারের পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব দফতর, নারায়ণহিতি প্যালেস মিউজিয়াম, আইন মন্ত্রক এবং বিদেশ মন্ত্রকের নথিও খতিয়ে দেখা হয়।

কিন্তু তদন্তের শেষে জানা যায়, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি এবং ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি- দুটিরই মূল কপি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২০১৯ সালেও একই কথা জানিয়েছিল নেপাল

২০১৯ সালেই তৎকালীন নেপালের বিদেশমন্ত্রী প্রদীপ গ্যাওয়ালি জানিয়েছিলেন, নেপালের কাছে দুই চুক্তিরই কপি রয়েছে। কিন্তু সেগুলি সত্যিই মূল নথি কি না, তা ফরেনসিকভাবে যাচাই করতে হবে। সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, নেপাল ঐতিহাসিক নথি এবং মানচিত্র খুঁজে দেখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভারত এবং ব্রিটেনের কাছেও ওই সময়কার ঐতিহাসিক নথি ও মানচিত্র খোঁজার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল।

অর্থাৎ, দুই শতাব্দীরও বেশি পুরনো একটি চুক্তিকে ঘিরে যে সীমান্ত দাবি তৈরি হয়েছে, তার ক্ষেত্রে মূল নথির অস্তিত্ব নিয়েই নেপালের ভিতরে এখনও নিশ্চিত তথ্য নেই।

কেন ২১০ বছর পরেও এত গুরুত্বপূর্ণ সুগৌলি চুক্তি?

সুগৌলি চুক্তির ইতিহাস ১৮১৪-১৬ সালের অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধে নেপালের পরাজয়ের পর ব্রিটিশ ভারত এবং নেপালের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণের জন্য এই চুক্তি করা হয়। ১৮১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৮১৬ সালের মার্চে তা অনুমোদিত হয়। পরবর্তী সময়ে এটিই নেপালের আধুনিক ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। আজকের ভারত-নেপাল সীমান্ত বিবাদে চুক্তিটির পঞ্চম ধারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারার মাধ্যমে নেপাল কালী নদীর পশ্চিমে থাকা ভূখণ্ডের উপর তার দাবি ত্যাগ করেছিল। ফলে কালী নদীকে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে দুই শতাব্দী ধরে চলা মূল প্রশ্ন। তা হল কালী নদীর প্রকৃত উৎস কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই ভারত ও নেপালের অবস্থান পরস্পরের থেকে আলাদা।

কালী নদীর উৎস নিয়েই মূল বিরোধ

নেপালের দাবি, কালী বা মহাকালী নদীর উৎস লিম্পিয়াধুরায়। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি এবং লিপুলেখ- তিনটি এলাকাই কালী নদীর পূর্বদিকে অবস্থিত। ফলে সেগুলি নেপালের ভূখণ্ডের মধ্যে পড়ে।

অন্যদিকে ভারতের অবস্থান, কালী নদীর উৎস লিপুলেখ অঞ্চলের নীচের দিকের ঝরনাগুলিতে। ভারত তার দাবির সমর্থনে প্রশাসনিক নথি এবং রাজস্ব সংক্রান্ত রেকর্ডের কথা তুলে ধরে। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, কালাপানি ঐতিহাসিকভাবে অবিভক্ত উত্তরপ্রদেশের পিথোরাগড় জেলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। বর্তমানে পিথোরাগড় উত্তরাখণ্ডের অংশ। দুই দেশই নিজেদের দাবির সমর্থনে ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র, প্রশাসনিক নথি এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক রেকর্ডের উল্লেখ করে থাকে।

সুগৌলি চুক্তিতেই কি লিম্পিয়াধুরার কথা লেখা ছিল?

বিতর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সুগৌলি চুক্তিতে সরাসরি লিম্পিয়াধুরাকে কালী নদীর উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এমন কোনও পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত মানচিত্রের অস্তিত্বও জানা যায় না, যা চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী নদীর উৎস হিসেবে লিম্পিয়াধুরাকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছিল। ফলে শুধু ১৮১৬ সালের চুক্তির ভাষা নয়, সেই সময়কার মানচিত্র, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক নথিও ভারত ও নেপালের দাবির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Advertisement

২০২০ সালে বিবাদ চরমে পৌঁছয়

লিপুলেখ-কালাপানি-লিম্পিয়াধুরা নিয়ে ভারত-নেপাল বিবাদ সবচেয়ে বড় আকার নেয় ২০২০ সালে। ভারত উত্তরাখণ্ড থেকে লিপুলেখ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা উদ্বোধন করে। কৈলাস মানস সরোবর যাওয়ার পথের সঙ্গে যুক্ত এই রাস্তা নিয়ে নেপাল তীব্র আপত্তি জানায়। নেপালের দাবি ছিল, রাস্তার একটি অংশ নেপালের ভূখণ্ডের উপর দিয়ে গিয়েছে। এর পর তৎকালীন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির সরকার নতুন একটি রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে। সেই মানচিত্রে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি এবং লিপুলেখকে নেপালের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়। এরপর নেপালের সংসদ সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে নতুন মানচিত্রকে অনুমোদন করে। নেপালের সংবিধানের অংশ হিসেবেও নতুন মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ভারতের পাল্টা অবস্থান

নেপালের এই পদক্ষেপ ভারত মেনে নেয়নি। ভারত এই মানচিত্রকে একতরফা পদক্ষেপ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, নেপালের এই নতুন ভূখণ্ডগত দাবি ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নয়। ভারত নেপালের এই পদক্ষেপকে artificial enlargement বা কৃত্রিমভাবে ভূখণ্ডগত দাবি বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবেও বর্ণনা করে। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের উপর গুরুতর প্রভাব পড়ে।

POST A COMMENT
Advertisement