
প্রশান্ত মহাসাগরে একাধিক ঘূর্ণাবর্ত অ্যাক্টিভপশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে তাণ্ডব চলছে। একসঙ্গে একাধিক ঘূর্ণাবর্ত অ্যাক্টিভ। যার নির্যাস, একাধিক দেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যেই টাইফুন ডলফিনের চিনের পূর্ব উপকূলে ল্যান্ডফল হয়েছে। ওদিকে আরেকটি বিধ্বংসী ঝড় চ্যান-হোম এগিয়ে চলেছে জাপানের দিকে।
মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে আরও ৩টি সিস্টেম ঘুরপাক খাচ্ছে। এই তাণ্ডব পরিস্থিতি শুধুমাত্র সংলগ্ন অঞ্চলেই দুর্যোগ হচ্ছে না, এই সবের প্রভাব ভারতেও পড়তে পারে। টাইফুন ডলফিন চলতি বছরে চিনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রপিক্যাল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ৯ অগাস্ট স্থানীয় সময়বিকেল প্রায় সাড়ে ৫ টায় ঝেজিয়াং প্রদেশের ইউহুয়ানের কাছে স্থলভাগে আছড়ে পড়ে। স্থলভাগে আঘাত হানার সময় এর সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৫০-১৫১ কিলোমিটার, যা স্যাফির-সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ১ হ্যারিকেনের সমতুল্য। প্রায় এক ঘণ্টা পর ঝড়টি ওয়েনঝৌয়ের কাছে দ্বিতীয়বার স্থলভাগে আঘাত হানে।
চিনে আছড়ে পড়ল বিধ্বংসী টাইফুন
এর আগে এটি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ওকিনাওয়া প্রিফেকচারের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, যেখানে এর কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় চিনে আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ঝড়ের প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শুধু ওয়েনঝৌ শহরেই ৯ লক্ষের বেশি মানুষকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি হাজার হাজার জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা হয়েছিল।

শুধু ওয়েনঝৌ নয়, সাংহাই থেকেও হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ঝড়ের কারণে প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৫০০টি বিমান বাতিল করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি, তীব্র ঝোড়ো হাওয়া, বন্যা এবং ভূমিধসের আশঙ্কায় প্রশাসনের তরফে সর্বোচ্চ স্তরের রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। পরবর্তীতে টাইফুনটি কিছুটা দুর্বল হয়ে ক্রান্তীয় ঝড়ে পরিণত হয় এবং স্থলভাগের দিকে এগিয়ে যায়। আবহাওয়া দফতরের আশঙ্কা, বুধবার পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঝেজিয়াং, জিয়াংসু, আনহুই এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে পার্বত্য এলাকায় নদী প্লাবিত হওয়া এবং ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি তৈরি হওয়া ডলফিন ঝড় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিনে পৌঁছেছে। ঝড়টির স্থায়িত্বও ছিল সাধারণ হ্যারিকেনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এমনকি একসময় এটি সুপার হারিকেনের তীব্রতাও অর্জন করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের কাছে এই ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আরও শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে টাইফুন চ্যান-হোম
এদিকে আরও একটি ঘূর্ণিঝড় নিয়ে সতর্কতা জারি হয়েছে জাপানে। টাইফুন চ্যান-হোম উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ১৪তম ঘূর্ণিঝড়। বর্তমানে এটি উত্তর-পূর্ব জাপানের দিকে এগোচ্ছে। বিশেষ করে হনশু দ্বীপের মধ্য বা উত্তর-পূর্ব অংশে এর প্রভাব পড়তে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা অথবা রাতের মধ্যে ঝড়টি জাপানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে অথবা তার কাছ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। বর্তমানে এর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ নট। ধীরে ধীরে ঝড়টি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্থলভাগে পৌঁছনোর সময় এর শক্তি কিছুটা কমেও যেতে পারে।

চ্যান-হোমের প্রভাবে জাপানে ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া এবং উত্তাল সমুদ্রের আশঙ্কা রয়েছে। আগে থেকেই সক্রিয় থাকা অন্যান্য ঝড়ের সঙ্গে এই সিস্টেমের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অস্থির আবহাওয়া তৈরি হতে পারে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি-সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ইতিমধ্যেই উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
জাপান সাগরের দিকে এগোনোর সময় চ্যান-হোম ক্রান্তীয় নিম্নচাপে পরিণত হয়ে আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাপানে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও বন্যা, ভূমিধস এবং যান চলাচলে ব্যাপক সমস্যার আশঙ্কা থাকছে।
ভারতের মৌসুমি বায়ুতেও কি পড়বে প্রভাব?
এখন বড় প্রশ্ন হল, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের এত দূরে তৈরি হওয়া এই ঝড়গুলির কোনও প্রভাব কি ভারতের মৌসুমি বায়ুর উপর পড়তে পারে? এই ঝড়গুলি সরাসরি ভারতের দিকে এগিয়ে না এলেও বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের মাধ্যমে পরোক্ষ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পশ্চিম উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরির প্রক্রিয়ার উপর পড়তে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঝড় তৈরি হলে তা বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা এবং শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছনো আর্দ্রতার পরিমাণেও প্রভাব পড়তে পারে। একইসঙ্গে মৌসুমি অক্ষরেখার অবস্থান বদলাতে পারে এবং বঙ্গোপসাগরে নতুন নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ তৈরির প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এই নিম্নচাপগুলিই মধ্য, পূর্ব এবং উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে কোনও শক্তিশালী ঝড় দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকলে সাময়িকভাবে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলফিনের মতো কোনও একটি ঝড়ের ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। এর প্রভাব নির্ভর করবে ঝড়টি কতদিন শক্তিশালী থাকে এবং কোন পথে এগোয় তার উপর।
IMD তাই প্রশান্ত মহাসাগরের এই ধরনের দূরবর্তী আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলির উপর নজর রাখে। এল নিনো এবং প্রশান্ত মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড়ের কার্যকলাপ একসঙ্গে ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।