
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এবারের ইতালি সফর কূটনৈতিক ভাবে ভীষণ তাত্পর্যপূর্ণ ছিল। Melody-Meloni মুহূর্ত থেকে চকোলেট গিফট। ইতালি সফরে এবার শুধু কূটনৈতিক বৈঠক বা নীতিগত আলোচনা নয়, ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

বিশেষভাবে বেছে নেওয়া উপহারের মাধ্যমে ভারতের হস্তশিল্প, বয়নশিল্প, সঙ্গীত এবং খাদ্য সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরা হয় ইতালির শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে। কূটনীতির পাশাপাশি এই সফরে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’-এরও স্পষ্ট প্রকাশ দেখা গেল।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে প্রধানমন্ত্রী মোদী উপহার দেন একটি বিশেষ মনিপুরের বিখ্যাত সিল্কের শাল। এই শালটি মনিপুরের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের প্রতীক। বিরল শিরুই লিলি ফুল থেকে অনুপ্রাণিত এই নকশা শুধুমাত্র মণিপুরের উখরুল জেলার শিরুই কেশং পিক এলাকাতেই দেখা যায়।

ঘণ্টার মতো আকৃতির এই ফুল মনিপুরের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সূক্ষ্ম নকশা ও ঐতিহ্যবাহী বুননের মাধ্যমে এই উপহার উত্তর-পূর্ব ভারতের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে।

মজার বিষয় হল, লিলি ফুল ইতালির সংস্কৃতিতেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রেনেসাঁ শিল্পে এই ফুল বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও শিল্পরুচির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ফলে এই উপহারের মধ্যে ভারত ও ইতালির সাংস্কৃতিক সংযোগের একটি সূক্ষ্ম বার্তাও ছিল।

শুধু শিরুই লিলি শালই নয়, প্রধানমন্ত্রী মোদী উপহার দেন অসমের বিখ্যাত মুগা সিল্কের শালও। ‘গোল্ডেন শিল্ক’ নামে পরিচিত এই বিশেষ রেশমের স্বাভাবিক সোনালি আভা রয়েছে এবং এটি ভারতের অন্যতম মূল্যবান বস্ত্রশিল্প হিসেবে বিবেচিত। অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উৎপাদিত এই রেশম দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যন্ত টেকসই হওয়ার জন্য পরিচিত।

অন্যদিকে ইতালির প্রেসিডেন্ট সেরজিও মাতারেল্লাকে দেওয়া হয় একটি marble inlay work box এবং সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুই কিংবদন্তি শিল্পী পন্ডিত ভীমসেন যোশী ও এমএস সুব্বলক্ষ্মী গানের CD।

এই marble inlay craft ভারতের ঐতিহ্যবাহী ‘পচ্চিকারি’ শিল্পের নিদর্শন, যা তাজমহলের সূক্ষ্ম কারুকাজে দেখা যায়। এই শিল্পরীতির শিকড় ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের পয়েত্রা দুরা শিল্পকলার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়, যা পরে ভারতে মুঘল আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন মাত্রা পায়। ফলে এই উপহার ভারত ও ইতালির ঐতিহাসিক শিল্পসংযোগকেও তুলে ধরে।

এছাড়াও রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক QU Dongyu-কে উপহার দেওয়া হয় রাগির বার। এই উপহার ভারতের পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্যশস্য মিলেটকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার কৌশলেরই অংশ। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে মিলেট চাষের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই উপহারগুলি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিল্পকলার নীরব দূত হয়ে উঠেছিল।