স্কুলের জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা, তবুও শিক্ষক নেই; CAG রিপোর্টে বাংলার শিক্ষার ভয়াবহ ছবি

‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত স্কুলশিক্ষার প্রায় পুরো ক্ষেত্রটিই অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হল স্কুলে পড়ুয়াদের সুযোগ বাড়ানো, বৈষম্য কমানো, পরিকাঠামোর উন্নতি, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং পড়াশোনার ফল ভালো করা।

Advertisement
স্কুলের জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা, তবুও শিক্ষক নেই; CAG রিপোর্টে বাংলার শিক্ষার ভয়াবহ ছবিপ্রতীকী ছবি
হাইলাইটস
  • CAG-এর রিপোর্টে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ ছবি সামনে
  • টাকা থাকলেও খরচ করতে পারেনি সরকার

পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলির জন্য টাকা বরাদ্দ হলেও তার পুরোটা খরচ হয়নি, বহু স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম, আবার কোথাও বেশি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। স্কুলের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নজরদারির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। এই সব তথ্য উঠে  উঠে এসেছে CAG-এর রিপোর্টে।

২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ এই পাঁচ বছরের কাজ খতিয়ে দেখে রিপোর্ট তৈরি করেছে CAG। এই সময়কালে রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে এই অডিট করা হয়। রাজ্য, জেলা ও ব্লকস্তরের নথি পরীক্ষা করার পাশাপাশি বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং মুর্শিদাবাদ, এই ছয়টি জেলায় বিস্তারিত পরীক্ষা চালানো হয়। ১৮টি ব্লকের ৭২টি স্কুলকেও নমুনা পরীক্ষার আওতায় আনা হয়। 

‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত স্কুলশিক্ষার প্রায় পুরো ক্ষেত্রটিই অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হল স্কুলে পড়ুয়াদের সুযোগ বাড়ানো, বৈষম্য কমানো, পরিকাঠামোর উন্নতি, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং পড়াশোনার ফল ভালো করা।

রিপোর্টে উল্লেখ, ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯৩,৮৬৫টি স্কুল এবং ১ কোটি ৭৬ লক্ষ স্কুলপড়ুয়া ছিল। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ স্কুল সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং মোট পড়ুয়ার ৯৩ শতাংশ এই স্কুলগুলিতে পড়ত।

বরাদ্দ টাকা পড়ে রয়েছে, হিসাব রাখাতেও গাফিলতি

CAG-এর রিপোর্ট বলছে, সমস্যাটা শুধু টাকার অভাব নয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা হাতে আসার পরও তা সময়মতো খরচ করা হয়নি। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত 'সমগ্র শিক্ষা' প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের অর্থ ব্যবহারের হার ছিল মাত্র ৪৬ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। এই সময়ে কেন্দ্রের তরফে রাজ্য পেয়েছিল ৬,০৩০.৬৮ কোটি টাকা। রাজ্যের নিজের ছিল ৪,৩৫৫.৭১ কোটি টাকা। কিন্তু একাধিক অর্থবর্ষের শেষে বিপুল টাকা অব্যবহৃত থেকে যায়।

কেন্দ্রের টাকা 'পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন' এর কাছে পৌঁছতে সর্বোচ্চ ৮৫ দিন সময় লেগেছে। আবার রাজ্যের নিজের অংশের টাকা ছাড়তে সর্বোচ্চ ১৩৯ দিন দেরি হয়েছে। কেন্দ্রের কাছে ব্যবহারের শংসাপত্র পাঠাতেও ৯ থেকে ১১ মাস দেরি হয়েছে। এর ফলে পরের দফায় কেন্দ্রের কাছ থেকে কম টাকা পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। CAG-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রতিশ্রুত অংশ এবং বাস্তবে পাওয়া টাকার মধ্যে মোট ঘাটতি ছিল ২,৪২৭.৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রের অংশে ঘাটতি ১,৬৫৭.৮৮ কোটি এবং রাজ্যের অংশে ৭৬৯.৯৯ কোটি টাকা। এর বড় কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেন্দ্রের দেওয়া নিয়মিত অনুদান খরচ না হওয়ার কথা জানিয়েছে অডিট।

Advertisement

বছরের পর বছর পড়ে ছিল স্কুলের নির্মাণকাজ

পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় গাফিলতির ছবি সামনে এসেছে। ২০০৪-০৫ থেকে ২০০৯-১০ সালের মধ্যে অনুমোদিত ৪,০৩৪টি নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত শুরুই হয়নি। এর মধ্যে ছিল শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার এবং র‌্যাম্প তৈরির কাজ। পরে এই কাজগুলির জন্য বরাদ্দ ৩৯৫.৩৪ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এছাড়া, 'সমগ্র শিক্ষা' প্রকল্পের আওতায় অনুমোদিত নয় এমন কাজে ৬.১৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩.৭৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে ট্যাব বিতরণ, কৃতী পড়ুয়াদের সংবর্ধনা এবং পড়ুয়াদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে। আরও ২.৩৫ কোটি টাকা চারটি জেলায় 'তরুণের স্বপ্ন' প্রকল্পে খরচ করা হয়েছে। এটি আলাদা রাজ্য সরকারি প্রকল্প, যার মাধ্যমে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ডিজিটাল যন্ত্র কেনার জন্য আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছিল। CAG জানিয়েছে, এই খরচকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বলে রাজ্যের দেওয়া যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বিজ্ঞাপনের খরচ 'সমগ্র শিক্ষা' প্রকল্পের কোনও নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

৬৮২ কোটি টাকার হিসাব মেলেনি

আর্থিক হিসাব রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের শেষে রাজ্য ও জেলাস্তরে মোট ৬৮২ কোটি টাকার গাফিলতি স্পষ্ট হয়েছে। ছয়টি পরীক্ষিত জেলাতেই এই অঙ্ক ছিল ৯৫.১৪ কোটি টাকা। ব্যবহারের শংসাপত্র এবং অগ্রিমের হিসাব রাখার রেজিস্টার না থাকায় টাকা কোথায় এবং কীভাবে খরচ হয়েছে, তা সবসময় বোঝা সম্ভব হয়নি। এতে টাকা নয়ছয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে CAG।

পুরুলিয়ায় নির্মাণকাজের জন্য ৪৪.৫৪ লক্ষ টাকা তোলা হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ২১.৬৩ লক্ষ টাকার হিসাব পাওয়া যায়। বাকি ২২.৯১ লক্ষ টাকার কোনও তথ্য সামনে আসেনি। তদন্তে বিষয়টি উঠে আসার পরেও সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।

কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি

শিক্ষকের সংখ্যা এবং বণ্টনের ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা রয়েছে। প্রাথমিকস্তরে ১৯,১৬৫টি স্কুলে, অর্থাৎ মোট প্রাথমিক স্কুলের ২৯ শতাংশে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নিয়মের তুলনায় খারাপ ছিল। এই স্কুলগুলিতে নিয়ম মেনে পড়াতে আরও ৩১,৬৮৪ জন শিক্ষক প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে ২১,৬৭৯টি প্রাথমিক স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় ৩২,৮৪০ জন শিক্ষক বেশি ছিলেন। ৫,১৫২টি প্রাথমিক স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক ছিলেন। এতে প্রভাবিত হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার পড়ুয়া। আবার ৫২০টি স্কুলে কোনও শিক্ষকই ছিলেন না। এর ফলে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে ৮,৫৯৬ জন শিশু। মুর্শিদাবাদের কয়েকটি স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৪৩২:১ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

উচ্চ মাধ্যমিকস্তরেও একই সমস্যা। রাজ্যের ২০ শতাংশ স্কুলে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ ছিলেন না। ১,৫৬২টি স্কুলে কর্মশিক্ষার শিক্ষক এবং ২,০৬১টি স্কুলে শরীরশিক্ষার শিক্ষক ছিলেন না। আবার অন্য কিছু স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষককে দেখা গিয়েছিল। পরীক্ষা করা ৩৪টি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে ৩২টিতে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৩০:১-এর বেশি ছিল। কোথাও তা ২৩৩:১ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেও খরচ হয়নি টাকা

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই ছবি। ছয়টি পরীক্ষিত জেলায় কর্মরত শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ৫৬.২৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু খরচ হয়েছে মাত্র ০.৬৭ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের মাত্র ১.১৯ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। শিশু শিক্ষা কেন্দ্র বা SSK এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র বা MSK-তেও শিক্ষকের ঘাটতি তথ্য রয়েছে রিপোর্টে। 

Advertisement

২০২৩-২৪ সালে ৩,৮৭৯টি SSK-তে, অর্থাৎ ২৫ শতাংশ SSK-তে মাত্র একজন করে শিক্ষক ছিলেন। ৭৬৫টি MSK-তে, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ MSK-তে চারজনেরও কম শিক্ষক ছিলেন। ৫২০টি SSK/MSK-তে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৪০:১-এর নিয়মের চেয়েও বেশি ছিল। শিক্ষা দফতর জানিয়েছিল, ২০১০ সালের পর এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। শিক্ষক না থাকায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গিয়েছে।

শিশুশ্রমিকদের স্কুলে ফেরানোর ক্ষেত্রেও ঘাটতি

শিশুশ্রমিকদের স্কুলে ফেরানোর ব্যবস্থাও যথেষ্ট কার্যকর হয়নি। বাঁকুড়ায় ২০১৯-২০ সালের একটি সমীক্ষায় ১,৪৭৭ জন শিশুশ্রমিকের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ১,০৭০ জন কখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি। আরও ৩৫৪ জন স্কুলছুট হয়ে গিয়েছিল। এই ১,৪২৪ জন শিশুকে বয়স অনুযায়ী শ্রেণিতে ভর্তি করানোর জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মুর্শিদাবাদে ২০১৫ সালের এপ্রিলের পর আর কোনও শিশুশ্রমিক সমীক্ষাই করা হয়নি।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্যও বড় ঘাটতি

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থার ছবিও উদ্বেগজনক। পাঁচটি পরীক্ষিত জেলায় ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত ১৭,০০৮ জন যোগ্য শিশু যাতায়াত ভাতা পায়নি। আরও ২৪,৯১৯ জন পায়নি সহায়ক বা এসকর্ট ভাতা। জেলা অনুযায়ী, যোগ্য শিশুদের মধ্যে ৩০ থেকে ৫৬ শতাংশ যাতায়াতের সুবিধা পায়নি। ৩৫ থেকে ৪৯ শতাংশ শিশু এসকর্ট ভাতা পায়নি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়েদের মধ্যে ৭২,২৬৭ জন ভাতার যোগ্য ছিল। তাঁদের মধ্যে ১৫,৫৯৩ জন, অর্থাৎ ২২ শতাংশ নির্ধারিত বৃত্তি পায়নি। দক্ষিণ দিনাজপুরে এই বঞ্চনার হার ছিল ৬১ শতাংশ।

পরিকাঠামোর ছবিও খুব ভালো নয়। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৮৩,৩৭৩টি সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা স্কুলের মধ্যে ১২,৫০৩টিতে কোনও র‌্যাম্প ছিল না। ৬০,০৮৪টি স্কুলে, অর্থাৎ ৭২ শতাংশ স্কুলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী শৌচাগার ছিল না।

অডিটের সময় তিনটি রিসোর্স রুমকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। রাজ্যে ৩৫,৫৫৭টি স্কুলে মোট ৩,১৫,৪১১ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু পড়াশোনা করত। তাঁদের জন্য বিশেষ শিক্ষকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,৭২২ জন। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৩৩,৮৩৫ জন বিশেষ শিক্ষকের।

স্কুলে ভর্তি বাড়লেও পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন

রিপোর্টে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে ভর্তির হার বেশ কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় গড়ের তুলনায় ভালো। ২০২৩-২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে মোট ভর্তির হার ছিল ১০৯.৬ শতাংশ। উচ্চ প্রাথমিক স্তরে ১০২.২ শতাংশ, মাধ্যমিকে ১০১.৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৬৬.১ শতাংশ।

তবে উপরের শ্রেণিতে উঠতে উঠতে পড়ুয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উচ্চ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত পড়ুয়া ঝরে পড়েছে বা পরবর্তী স্তরে পৌঁছতে পারেনি।

২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়ার সংখ্যা ১১.৫ লক্ষ থেকে কমে নবম শ্রেণিতে ৬.৬৬ লক্ষ হয়েছে। অর্থাৎ ৪২ শতাংশ কমেছে।
স্কুলছুট ৫৮১ জন শিশুকে নিয়ে করা সমীক্ষায় ৫৩ শতাংশ জানিয়েছে, দারিদ্র্য বা আর্থিক সমস্যার কারণে তারা পড়াশোনা ছেড়েছে। ১৩ শতাংশ ছেলে অন্যত্র গিয়ে উপার্জন শুরু করেছে। ১২ শতাংশ বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা বন্ধ করেছে। ৪ শতাংশ কাজ শুরু করেছে, মূলত পরিবারের খরচ চালাতে শ্রমিক হিসেবে।

মডেল স্কুলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি

রাজ্যের ৬০টি মডেল স্কুলও CAG-এর নজর এড়ায়নি। কোনও স্কুলই ৬৪০ জন পড়ুয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এই ৬০টি স্কুলে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ছিল ৭,০৯২। অর্থাৎ প্রতি স্কুলে গড়ে মাত্র ১১৮ জন। এটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৮ শতাংশ। একটি স্কুলে কোনও পড়ুয়াই ছিল না। এই ৬০টি স্কুলে মোট ২৯৯ জন শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জন ছিলেন অতিথি শিক্ষক।

Advertisement

উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের পাঁচটি স্কুলে কোনও নিয়মিত শিক্ষকই ছিলেন না। পরীক্ষিত স্কুলগুলির মধ্যে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পড়ুয়ার সংখ্যা ৫৬ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর সঙ্গে ছিল শিক্ষকের তীব্র ঘাটতি।

 শ্রেণিকক্ষ কম, ডিজিটাল শিক্ষাতেও ঘাটতি

শ্রেণিকক্ষের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। নির্ধারিত ছাত্র-শ্রেণিকক্ষ অনুপাত ৪০:১। কিন্তু প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকের ১২ শতাংশ স্কুলে এই অনুপাত নিয়মের তুলনায় বেশি ছিল। মাধ্যমিকস্তরে এই হার ৩৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকস্তরে ৬৬ শতাংশ। একটি পরীক্ষিত স্কুলে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বিভিন্ন বিভাগকে শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের অভাবে একদিন অন্তর স্কুলে আসতে হয়েছে।

ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ১৬,৫৭০টি উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে ৪২ শতাংশে আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা ছিল না। ৪৭ শতাংশ স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব ছিল না। ৭০ শতাংশ স্কুলে কোনও আইসিটি শিক্ষকও ছিলেন না।

দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে বহু পড়ুয়া ফেল

CAG-এর মতে, পরিকাঠামো ও শিক্ষকের ঘাটতির প্রভাব পড়াশোনার ফলাফলেও পড়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ৫ লক্ষ ৬ হাজার পড়ুয়া ফেল করেছে। প্রতি বছর ফেল করার হার ছিল ১০ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে। ২০২১ সালে অবশ্য কোভিডের কারণে প্রচলিত পরীক্ষা হয়নি। দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষিত বছরগুলিতে ১২ থেকে ১৭ শতাংশ পড়ুয়া ফেল করেছে। পাশ করা পড়ুয়াদের মধ্যে মাত্র ১৬ থেকে ৩৮ শতাংশ প্রথম বিভাগ পেয়েছে।

CAG নিজে ৭২টি নমুনা স্কুলের ১,১৪৫ জন পড়ুয়ার ফল পরীক্ষা করে। প্রায় ৪০৪ জন পড়ুয়া বিভিন্ন বিষয়ে ৪০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে।

অঙ্কে দুর্বলতা ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। তৃতীয় শ্রেণির ৫৭ শতাংশ, পঞ্চম শ্রেণির ৩৬ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণির ৩৫ শতাংশ এবং দশম শ্রেণির ৬২ শতাংশ পড়ুয়া গণিতে ৪০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে।

বৃত্তিমূলক শিক্ষাতেও পিছিয়ে বাংলা

বৃত্তিমূলক শিক্ষা পৌঁছেছে মাত্র ৭.৯২ শতাংশ স্কুলে। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর লক্ষ্য ছিল ৫০ শতাংশ স্কুলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করা। বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু থাকা ১,৪৫২টি স্কুলের মধ্যে ৩৪৫টিতে কার্যকর ল্যাবরেটরি ছিল না। আইটিআই এবং পলিটেকনিকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও ছিল না। বৃত্তিমূলক কোর্স শেষ করার পরে পড়ুয়ারা চাকরি পেল কি না বা তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হল কি না, তা জানারও কোনও ব্যবস্থা ছিল না রাজ্যে।

 নজরদারির ব্যবস্থাতেও বড় ফাঁক

CAG-এর রিপোর্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সমস্যাগুলির কথা উঠে এসেছে, তার একটি হল নজরদারির দুর্বলতা। 'সমগ্র শিক্ষা' প্রকল্পের নীতি নির্ধারণ এবং কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য যে পরিচালন পরিষদ থাকার কথা, ২০১৯-২৪ সালের পুরো অডিট সময়ে সেটি একবারও বৈঠক করেনি। CAG জানিয়েছে, ২০০৫ সালের এপ্রিলের পর এই পরিষদের কোনও বৈঠকের নথিও 'পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন' দেখাতে পারেনি।

জেলাস্তরের নজরদারি কমিটিও গঠন করা হয়নি।

স্কুল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার কথা স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির। কিন্তু পরীক্ষিত জেলাগুলিতে ৩৫ থেকে ৮৪ শতাংশ স্কুলে এই কমিটি ছিল না। ২০১৯-২৪ সালের মধ্যে পরীক্ষিত ৭২টি স্কুলের কোনওটিই স্কুলের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করেনি। এমনকি প্রতি বছর যে পরিবারভিত্তিক সমীক্ষার মাধ্যমে এলাকার শিশুদের স্কুলে আনা এবং স্কুলের প্রয়োজন বুঝে পরিকল্পনা করার কথা, সেই সমীক্ষাও করা হয়নি। অর্থাৎ রাজ্যে প্রতি বছর পরিকল্পনা তৈরি হলেও স্কুলস্তরের বাস্তব তথ্য এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সেই পরিকল্পনা তৈরি হয়নি।

 কী কী সুপারিশ CAG-এর?

CAG-এর সুপারিশের মূল লক্ষ্য নতুন প্রকল্প তৈরি করা নয়, বরং যে প্রকল্প রয়েছে তার বাস্তবায়ন ঠিক করা। দীর্ঘমেয়াদি এবং স্কুলস্তর থেকে পরিকল্পনা তৈরি, সময়মতো বরাদ্দ টাকা খরচ, পিছিয়ে থাকা জেলাগুলিতে বিশেষ নজর, প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের সঠিকভাবে বণ্টন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের ওপর জোর দিয়েছে CAG। একই সঙ্গে জেলা ও স্কুল স্তরে নিয়মিত নজরদারি কমিটি তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে।

Advertisement

সব মিলিয়ে CAG-এর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা এবং ভর্তির হার অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় গড়ের চেয়ে ভালো হলেও তার নীচে রয়েছে একাধিক বড় সমস্যা।

কোথাও বরাদ্দ টাকা পড়ে রয়েছে, কোথাও বছরের পর বছর নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম, আবার কোথাও বেশি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। মাধ্যমিকের পর বহু পড়ুয়া স্কুলছুট হচ্ছে। একই সঙ্গে পড়াশোনার ফল এবং প্রাথমিক শিক্ষার ভিত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

CAG-এর রিপোর্টের মূল বক্তব্য তাই শুধু শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসা নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হল, বরাদ্দ টাকা যেন সত্যিই শ্রেণিকক্ষে পৌঁছয়, প্রয়োজনীয় শিক্ষক যেন পড়ুয়াদের কাছে থাকেন এবং স্কুলে এসে শিশুরা যেন ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে।
 

POST A COMMENT
Advertisement