Kali Puja At Police Station: থানায় কালীপুজো কীভাবে শুরু হয়েছিল? যে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে ব্রিটিশদের উপর 'রাগ'

রাজ্যে থানায় থানায় কালীপুজো করতে হবে। এমনই আহ্বান জানিয়েছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। থানায় থানায় কালীপুজোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলায়। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই প্রথা চলে আসছে। কীভাবে কালীপুজো হয় থানায়?

Advertisement
থানায় কালীপুজো কীভাবে শুরু হয়েছিল? যে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে ব্রিটিশদের উপর 'রাগ'থানায় থানায় কালীপুজোর ইতিহাস
হাইলাইটস
  • থানায় থানায় কালীপুজো করার প্রস্তাব মন্ত্রীর
  • থানায় কালীপুজোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলায়
  • সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই প্রথা চলে আসছে

রাজ্যে থানায় থানায় কালীপুজো করতে হবে। এমনই আহ্বান জানিয়েছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রস্তাব, রাজ্যের প্রতিটি থানায় যেন নিয়ম করে কালীপুজো করা হয়, কালীমূর্তি রাখা হয়। স্কুলে যেমন সরস্বতী পুজো বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ, কেমনই থানায় কালীপুজো পুলিশি সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠুক বলে দাবি মন্ত্রীর। প্রশাসনের ধর্মীয়করণ, সংবিধানবিরোধী বলে বিরোধীরা সরব হলেও থানায় থানায় কালীপুজোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলায়। 

পুলিশকে প্রায়শ্চিত্ত করার পরামর্শ মন্ত্রীর
মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, 'রঘু ডাকাতও কিন্তু ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মা কালীর পুজো করে যেতেন। এটার মধ্যে ধর্মাচার নেই। থানায় কালীমূর্তি থাকা দরকার। চোর যখন থানায় ঢুকবে, তখন মনে মনে বলবে মা যেন ছাড়া পাই। আর পুলিশ যখন বেরোবে, তখন প্রার্থনা করবে, আসামি যেন ধরা পড়ে।' তিনি আরও বলেন, 'বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থানায় কালীপুজো করতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে তুলেছিলেন, এই দুইয়ের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ থানায় কালীপুজো করুক।'

থানায় থানায় কালীপুজোর ইতিহাস
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ডাকাত দলের চরম উপদ্রব ছিল। রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাত বা বুধো ডাকাতের মতো কুখ্যাত দস্যুরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে শক্তির দেবী মা কালীর আরাধনা করত। লোকবিশ্বাস ছিল, দেবীর কৃপা ছাড়া যুদ্ধে বা লুণ্ঠনে জয়লাভ অসম্ভব। পরাধীন ভারতে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা ছিলেন মূলত ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ। তারা ভারতীয় অধস্তন পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করতেন এবং সনাতন ধর্মের রীতিনীতিকে 'বর্বরতা' বা 'অসভ্যতা' বলে অবজ্ঞা করতেন। ব্রিটিশদের এই বর্ণবাদী মানসিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে এবং নিজের শক্তি ও আত্মপরিচয় জাহির করতে ভারতীয় পুলিশ কর্মীরা থানার ভেতরেই মহাশক্তি দেবী কালীর আরাধনা শুরু করেন। দেবী কালী ছিলেন অত্যাচারী অসুর বিনাশের প্রতীক, যা সে সময়ের বাঙালি বিপ্লবীদের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে অনুপ্রেরণা দিত। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতে এবং নিজেদের কর্তব্যের মাঝে শক্তির সঞ্চার করতে এই পুজোর আয়োজন করতেন। 

Advertisement

বারোয়ারি আর থানার পুজোর পার্থক্য কোথায়?
সাধারণ বারোয়ারি পুজোর চেয়ে থানার কালীপুজোর আবহ এবং প্রেক্ষাপট কিছুটা আলাদা। ব্রিটিশ আমল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন থানা প্রাঙ্গণে বা আশপাশে তান্ত্রিক মতে মা কালীর আরাধনা হয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর থানাপাড়ার কালীপুজো ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে, যেখানে পঞ্চমুণ্ডির আসন তৈরি করে তন্ত্রমতে পুজো শুরু হয়। আবার মালদার চাঁচল থানার কালীপুজোও ব্রিটিশ আমল থেকে জনপ্রিয়। বহু থানার কালীপুজোয় এখনও তন্ত্র মতে পুজো, পাঁঠাবলি কিংবা বিশেষ ভোগ নিবেদনের প্রথা রয়েছে। যেমন— গঙ্গারামপুর থানাপাড়ার কালীপুজোয় বোয়াল মাছের ভোগ দেওয়ার প্রচলন আছে। কালীপুজোর রাতে থানার OC বা IC-দের পুজোর সংকল্প করা হয়। 

থানার কাজ হল সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা এবং সাধারণ মানুষের রক্ষা নিশ্চিত করা। তাই পরবর্তীতে দুষ্টের দমনকারী এবং 'রক্ষাকালী'র ঘট স্থাপন করে বা মূর্তি গড়ে পুলিশ কর্মীরা থানার মধ্যেই প্রথা প্রচলন করেন। গ্রামাঞ্চলে যখন প্রথম পুলিশ চৌকি বা ফাঁড়ি তৈরি হয়, তখন পুলিশ কর্মীদের বেশিরভাগই ছিলেন স্থানীয় বাঙালি বা বিহারি হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বী। বাড়ি থেকে দূরে, প্রতিকূল পরিবেশে ডিউটি করার সময় মানসিক বল পাওয়ার জন্য তারা থানার চত্বরেই ছোট করে পুজো শুরু করেন, যা কালক্রমে একটি বড় ঐতিহ্যে রূপ নেয়।

থানার পুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক থানায় বহু প্রাচীন কাল থেকেই কোনও মুসলিম OC-র উদ্যোগে বা অহিন্দু পুলিশ কর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতায় ধুমধাম করে এই পুজো পরিচালিত হয়ে আসছে। যুগের নিয়ম নানা প্রথার পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে বহু থানায় এই পুজো উপলক্ষে রক্তদান শিবির, বস্ত্র বিতরণ এবং এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য খাবার দেওয়ার মতো সামাজিক কাজ শুরু হয়। 

বামফ্রন্ট ও তৃণমূলের আমলে কী হতো? 
উল্লেখ্য, বামফ্রন্ট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এর সমর্থক না হলেও, পুলিশ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বহু থানায় কর্মীদের নিজস্ব উদ্যোগে কালীপুজো অনুষ্ঠিত হতো। তৃণমূল সরকারের আমলেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল এবং অনেক থানার প্রাঙ্গণেই স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে কালী আরাধনা করা হয়েছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে কোনো লিখিত 'বাধ্যবাধকতা' বা নির্দেশিকা না থাকলেও, স্থানীয় স্তরে পুলিশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রাচীন প্রথার অংশ হিসেবে রাজ্যের বহু থানায় সাধারণভাবেই কালীপুজো আয়োজিত হত।
 

 

POST A COMMENT
Advertisement