পুজোয় কেমন বৃষ্টি? বর্ষার বিদায়ের সুর বেজে গিয়েছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আকাশেও তার প্রভাব স্পষ্ট। যে ঘন মেঘে কয়েক দিন আগেও দেশের বিস্তীর্ণ অংশ ঢেকে ছিল, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের একটা বড় অংশে এখন সেই মেঘের চাদর পাতলা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, তা হলে কি এবার বৃষ্টির পালা শেষ? বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে বাংলার আকাশ কি শুকনো থাকবে?
তবে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হয়েছে। ফলে একদিকে বর্ষা বিদায়ের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, অন্যদিকে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশে বৃষ্টির সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই দুই পরিস্থিতির কারণে আবহাওয়া নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
তবে ২৯ সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি এবং আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস মিলিয়ে আপাতত যে ছবি পাওয়া যাচ্ছে, তাতে পুজোর আগে বাংলায় বৃষ্টি হবে। একটানা ভারী বৃষ্টি হবে একথা বলা যায় না। তবে কোথাও কোথাও হালকা বা বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু এখনই বড়সড় দুর্যোগের ইঙ্গিত নেই।
বর্ষা বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু পুরোপুরি শেষ হয়নি
ভারতে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাহার ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পশ্চিম রাজস্থান থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর বর্ষা বিদায় নিতে শুরু করেছে। এরপর দিল্লি থেকেও ২৩ সেপ্টেম্বর বর্ষা সরে যায়। বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আরও কিছু অংশ থেকে মৌসুমি বায়ু সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
আবহাওয়া দফতর শুধু বৃষ্টি কমে গেলেই কোনও এলাকা থেকে বর্ষা বিদায় ঘোষণা করে না। টানা কয়েক দিন বৃষ্টির কার্যকলাপ কমে যাওয়া, বাতাসের গতিপথে পরিবর্তন এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো বিষয়ও বিবেচনা করা হয়।
অর্থাৎ, উত্তর-পশ্চিম ভারতে বর্ষা বিদায় নিলেও তার মানে এই নয় যে দেশের সব জায়গা থেকেই বৃষ্টি একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতসহ দেশের অন্য অংশে বর্ষার প্রভাব আরও কিছুদিন থাকতে পারে।
শেষ দফার বৃষ্টিতে ঘাটতি কমেছে ১৫ থেকে ১২ শতাংশ
এবারের বর্ষায় একটা সময়ে দেশের বৃষ্টির ঘাটতি বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দফার বৃষ্টিতে সেই ঘাটতি কিছুটা কমেছে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭৫০.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৮৫২.৯ মিলিমিটার। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে।
এর এক সপ্তাহ আগে, ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ দফার বৃষ্টিতে জাতীয় বৃষ্টির ঘাটতি ৩ শতাংশ কমেছে।
বঙ্গোপসাগরে একের পর এক নিম্নচাপের মতো সিস্টেম এবং উত্তর ভারতের উপর দিয়ে যাওয়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টি হয়েছে। উত্তর, উত্তর-পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু এলাকায় এই বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে।
ওড়িশাতেও বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে ১,৪৭৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ১,৩৭৮.৮ মিলিমিটার। অর্থাৎ সেখানে ৭ শতাংশ অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে। তবে গোটা দেশের ছবি এক নয়। কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে, কোথাও আবার ঘাটতি রয়ে গিয়েছে।
নতুন নিম্নচাপ কি ফের বৃষ্টি বাড়াবে বাংলায়?
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মায়ানমারের উপর থাকা গভীর নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। সেটি মায়ানমার ও সংলগ্ন পূর্ব-মধ্য এবং উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের কাছে অবস্থান করছিল।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সিস্টেমটি আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে দুর্বল হতে পারে। এরপর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ এবং সংলগ্ন মায়ানমার, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে ধীরে ধীরে আরও দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, সিস্টেমটি রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি আগের মতো শক্তিশালী গভীর নিম্নচাপ হিসেবে বাংলার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে, এমন পরিস্থিতি এখন নেই।
তা হলে বাংলায় কি বৃষ্টি একেবারেই হবে না?
তবে বৃষ্টি একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা বলা যাবে না। বঙ্গোপসাগর এবং স্থানীয় আবহাওয়ার প্রভাবে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
কিন্তু দক্ষিণবঙ্গের ক্ষেত্রে আপাতত বড় কোনও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা নেই। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক সতর্কতা তালিকাতেও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত কোনও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা নেই।
সিকিম ও উপ-হিমালয় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত কোনও সতর্কতা নেই বলে সংশ্লিষ্ট IMD বুলেটিনে দেখা যাচ্ছে। ফলে এখনকার পরিস্থিতিতে টানা ঝেঁপে বৃষ্টি বা বড়সড় দুর্যোগের আশঙ্কার চেয়ে বিক্ষিপ্ত হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনাই বেশি।
পুজোর সময় কেমন থাকবে আবহাওয়া?
২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পুজোর মূল দিনগুলির মধ্যে বেশ কিছুটা সময় রয়েছে। ফলে এখনই পুজোর প্রতিটি দিনের নির্দিষ্ট আবহাওয়া বলে দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে বর্তমান আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্ষা উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে সরে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির কার্যকলাপও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আগামী কয়েক দিনের জন্য বড় বৃষ্টির সতর্কতা নেই। ফলে পুজোর আগে বৃষ্টির দাপট কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই আপাতত বেশি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পুজোর দিনগুলিতে এক ফোঁটা বৃষ্টিও হবে না। স্থানীয় বজ্রগর্ভ মেঘ, বঙ্গোপসাগরের নতুন কোনও নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ কোথাও বৃষ্টি হতে পারে।
তাই এখনকার পরিস্থিতিকে সবচেয়ে সহজ ভাষায় বললে, পুজোয় বৃষ্টি হবে না- এমন নিশ্চয়তা এখনও নেই। কিন্তু পুজোর আগে বা পুজোর সময় টানা ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে।
বর্ষা কি তবে শেষের পথে?
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্ষার বিদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে গোটা দেশ থেকে বর্ষা একদিনে বিদায় নেয় না। উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে ধীরে ধীরে দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে প্রত্যাহার এগোয়। IMD-র নিয়ম অনুযায়ী, দেশের সম্পূর্ণ অংশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাহার ১ অক্টোবরের আগে ঘোষণা করা হয় না। তার জন্য বৃষ্টির ধারাবাহিকতা কমে যাওয়া, জলীয় বাষ্প কমে যাওয়া এবং কয়েক দিন শুকনো আবহাওয়া বজায় থাকার মতো পরিস্থিতি দেখতে হয়।
তাই এখন যে ছবিটা তৈরি হয়েছে, তাকে বলা যায় বর্ষার শেষ পর্ব। উত্তর-পশ্চিম ভারতে বর্ষার দাপট কমছে, দেশের বৃষ্টির ঘাটতিও শেষ দফার বৃষ্টিতে কিছুটা কমেছে। আর বাংলায় নতুন করে বড় বৃষ্টির মতো শক্তিশালী পরিস্থিতি আপাতত নেই।
ফলে একদিকে বর্ষা বিদায় নিচ্ছে, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের নতুন আবহাওয়া ব্যবস্থা পুরোপুরি বৃষ্টির সম্ভাবনা মুছে দেয়নি। ফলে ‘বৃষ্টি হবে’ এবং ‘বৃষ্টি হবে না’- দুই ধরনের কথারই কিছুটা ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু দুটির মধ্যে পার্থক্য হল বৃষ্টির মাত্রা ও বিস্তার। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলায় বৃষ্টি একেবারে শূন্য হয়ে যাচ্ছে না। তবে ভারী ও টানা বৃষ্টির সম্ভাবনা আপাতত কম। পুজোর আগে আকাশে রোদ-মেঘের খেলা, কোথাও কোথাও সামান্য বৃষ্টি এবং তুলনামূলক শুকনো আবহাওয়া- এই ছবিই এখন বেশি সম্ভাব্য।
আর পুজোর মূল দিন যত এগিয়ে আসবে, তখন নতুন করে বঙ্গোপসাগরে কোনও সিস্টেম তৈরি হচ্ছে কি না, বর্ষার প্রত্যাহার কতটা এগিয়েছে এবং স্থানীয় আবহাওয়ার পরিস্থিতি কেমন থাকছে- তার উপরই চূড়ান্ত ছবি নির্ভর করবে। অর্থাৎ, আপাতত পুজোর প্রস্তুতিতে বড় বৃষ্টির আতঙ্কে ভোগার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে ছাতা একেবারে বাড়িতে রেখে দেওয়ার সময়ও এখনও আসেনি।