
দেখুন দেবীর ভুবনমোহিনী সেই রূপবড়মা। ভক্তদের কাছে এই নামটাই যথেষ্ট। যা কিছু মনস্কামনা নিয়ে বড়মার কাছে যাওয়া হোক না কেন, বড়মা সবার কথা রাখেন, সবার কামনা পূরণ করেন। নৈহাটির বড়মা এতটাই জাগ্রত যে আজ গোটা রাজ্যজুড়ে তার পরিচিতি। কালীপুজোর বিশেষ দিনে নৈহাটিতে বড়মায়ের পুজো দিতে এবং তাঁর দর্শনে অগণিত মানুষ জমায়েত হয়েছেন এবারও। তবে এ বার নৈহাটির বড় মায়ের পুজোয় নেই কোনও ভিআইপি গেট।
১০৩ বছরে বড়মার পুজো
প্রসঙ্গত, প্রতি বছর দীপাবলি ও কালীপুজো উপলক্ষে নৈহাটির বড়মার দর্শন করতে দূরদূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। কেউ আসেন মানত পূরণ করতে, কেউ দেবীর আশীর্বাদ নিতে, আবার কেউ শুধুমাত্র একবার মায়ের দর্শন পাওয়ার আশায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে অপেক্ষা করেন। স্টেশন চত্বর থেকে মন্দিরের রাস্তা সর্বত্রই শোনা যায় ‘জয় বড়মার জয়’ ধ্বনি। ২০২৬ সালে নৈহাটির ঐতিহ্যবাহী বড়মার পুজো ১০৩ বছরে পা দিল। বড়মার দর্শনের পাশাপাশি দণ্ডি কাটা, পুষ্পাঞ্জলি এবং ভোগ বিতরণের সময়সূচি জানিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।

জেনে নিন বড়মার পুজোর সম্পূর্ণ সময়সূচি
২০২৬ সালের ৮ নভেম্বর, রবিবার নৈহাটির বড়মার কালীপুজো। পুজো উপলক্ষে ৭ নভেম্বর, শনিবার রাত ১২টা থেকেই শুরু হয়েছে ভক্তদের দণ্ডি কাটা। এই প্রক্রিয়া চলবে ৮ নভেম্বর, রবিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। অর্থাৎ, মানত পূরণের উদ্দেশ্যে রাত থেকেই দণ্ডি কাটতে পারছেন ভক্তরা। ৮ নভেম্বর রাত ১২টায় শুরু হচ্ছে বড়মার মূল পুজো। এরপর রাত দেড়টায় অনুষ্ঠিত হবে পুষ্পাঞ্জলি। তবে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ফুল ও বেলপাতা ভক্তদের নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এরপর রাত আড়াইটে থেকে শুরু হবে ভোগ ও প্রসাদ বিতরণ। পরের দিন, ৯ নভেম্বর, সোমবার বেলা ১১টা পর্যন্ত চলবে প্রসাদ বিতরণ। ফলে পুজোর রাতে মায়ের দর্শনের পাশাপাশি প্রসাদ গ্রহণের সুযোগও পাবেন ভক্তরা।

প্রায় ১০০ ভরি সোনা, ২০০ কেজি রুপোর গয়নায় সজ্জিত বড়ম
নৈহাটির বড়মার পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দেবীর বিশালাকার প্রতিমা এবং চোখধাঁধানো অলঙ্কার। বর্তমানে বড়মার গয়নায় রয়েছে প্রায় ১০০ ভরি সোনা এবং ২০০ কেজি রুপো। মুকুট, চাঁদমালা, ত্রিনয়ন, জিহ্বা, ভুরু ও নাকের অলঙ্কার-সহ একাধিক সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরি হয়েছে সোনা দিয়ে। ভক্তদের মানত পূরণ এবং স্বেচ্ছায় দানের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে বেড়েছে দেবীর অলঙ্কারের সংখ্যা। প্রতিটি গয়নার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভক্তদের বিশ্বাস, আবেগ ও শ্রদ্ধা। ১০৩ বছরের পুজোয় এ বার প্রায় ১ কুইন্টাল ১০ কেজি সোনা এবং রুপোর গয়নায় সাজানো হয়েছে ‘মা’কে। সেই আকর্ষণেই নৈহাটির অরবিন্দ রোডে উপচে পড়ছে ভক্তদের ভিড়। এ বার সোনার গয়না আর রুপোর চাঁদমালা ছাড়াও বিভিন্ন অলঙ্কারে সাজানো হয়েছে সুবিশাল প্রতিমাকে। তবে এ বারের বিশেষ আকর্ষণ ‘বড়মা’র কপালে হিরের টিপ। ‘নৈহাটি বড়মা পুজোকমিটি’র মুখপাত্র অনন্ত চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, সোনা ও রুপো মিলিয়ে এ বছর প্রতিমাকে সাজানো হয়েছে প্রায় ১ কুইন্টাল ১০ কেজি গয়না দিয়ে। তবে কতটা সোনা এবং রুপোর পরিমাণ নির্দিষ্ট করে প্রকাশ্যে জানাতে চাননি তিনি। অনন্ত চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘প্রত্যেক বছর ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে সোনা ও রুপোর দানের পরিমাণও বাড়ছে। বড়মার সোনার চোখ নিয়েও রয়েছে বিশেষ নিয়ম।’ তিনি জানান, বিসর্জনের সময় ‘বড়মা’র চোখ খোলা হয় না। প্রতিমার সঙ্গেই তা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ বারও সেই নিয়ম বজায় থাকবে।

বিপুল পরিমাণ ভোগ রান্না
কালীপুজোর দিন বড়মার উদ্দেশে বিপুল পরিমাণ ভোগ রান্না করা হয়। প্রায় ২ হাজার কেজি খিচুড়ি ও পোলাও প্রস্তুত করে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। সাদা অন্ন, পোলাও, খিচুড়ি, এঁচোড়ের তরকারি, ছানার তরকারি, পনির, ডাল, পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি, পায়েস, সুজি ও লুচি-সহ নানা পদ থাকে বড় মায়ের মায়ের ভোগের তালিকায়। অনেকের বিশ্বাস, বড়মার কাছে মন থেকে কোনও মানত করলে মা কাউকে নিরাশ করেন না। সেই বিশ্বাস থেকেই কেউ দণ্ডি কেটে পুজো দেন, আবার কেউ দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে মায়ের দর্শনের অপেক্ষা করেন।
১২ নভেম্বর বড়মার নিরঞ্জন শোভাযাত্রা কখন শুরু?
কালীপুজোর পর ১২ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে বড়মার নিরঞ্জন পুজো ও দধিকর্মা। ওই দিন বেলা ২টায় হবে বরণ। এরপর বিকেল ৪টে থেকে শুরু হবে বড়মার নিরঞ্জন শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করেও নৈহাটিতে বিপুল ভক্তসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে।