রামায়ণের কাহিনি কী বলছে? রইল চমকপ্রদ তথ্য। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝখানে সমুদ্রের বুকে পাথর, বালি ও চুনাপাথরের এক দীর্ঘ সারি। ভারতের রামেশ্বরম থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভৌগোলিক গঠন পরিচিত ‘রামসেতু’ নামে। আন্তর্জাতিক নাম অ্যাডামস ব্রিজ। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কায় পৌঁছতে এই পথই তৈরি করেছিল রামচন্দ্রের বানরসেনা। কিন্তু সমুদ্রের বুকে থাকা এই গঠন কি সত্যিই মানুষের তৈরি? নাকি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি?
২০০৭ সালে রামসেতুর উপগ্রহচিত্র প্রকাশ্যে আসে। অনেকেই বলেন, নাসার ছবি নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে যে রামসেতু মানুষের তৈরি। কিন্তু সেই দাবি কতটা সত্যি? বিজ্ঞানই বা এই গঠন সম্পর্কে কী বলছে?
রামায়ণে কী বলা হয়েছে?
বাল্মীকি রামায়ণের কাহিনি অনুযায়ী, সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কার দিকে যাত্রা করেছিলেন রামচন্দ্র। তাঁর সঙ্গে ছিল বিশাল বানরসেনা। সমুদ্রের সামনে পৌঁছে লঙ্কায় যাওয়ার পথ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই সময় নল নামে এক দক্ষ নির্মাতার নেতৃত্বে সেতু তৈরির কাজ শুরু হয় বলে ধর্মীয় কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বানরসেনা বড় বড় পাথর, গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য উপকরণ সমুদ্রে ফেলে একটি পথ তৈরি করেছিল। কিছু বর্ণনায় বলা হয়, মাত্র পাঁচ দিনেই শেষ হয়েছিল সেতু নির্মাণের কাজ। এই কাহিনি হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ঘটনা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। দুটিকে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা প্রয়োজন।
‘রাম’ নাম লিখলে কি পাথর জলে ভাসত?
রামসেতু নিয়ে জনপ্রিয় বিশ্বাসগুলির মধ্যে অন্যতম হল পাথরে ‘রাম’ নাম লেখার কাহিনি। লোকপ্রচলিত গল্পে বলা হয়, রামচন্দ্রের নাম লেখা পাথর সমুদ্রে ফেললেও ডুবে যেত না। বরং সেগুলি জলের উপরে ভেসে থাকত।
এই গল্প বহু মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে পাথরে নাম লিখলেই তা জলে ভাসে, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পাথরের ঘনত্ব, গঠন এবং তার মধ্যে থাকা বায়ুর পরিমাণের মতো বিষয় কোনও বস্তু জলে ভাসবে কি না, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
রামসেতুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি ছোট কাঠবিড়ালির গল্পও। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বানরসেনা যখন সেতু তৈরি করছিল, তখন একটি কাঠবিড়ালিও বালিতে গড়াগড়ি দিয়ে শরীরের বালি সেতুর কাছে ঝেড়ে দিচ্ছিল। তার ছোট্ট অবদান দেখে রামচন্দ্র তাকে স্নেহ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এই গল্পের মূল বার্তা, কোনও কাজের গুরুত্ব শুধু তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না।
সমুদ্রের মধ্যে আসলে কী রয়েছে?
রামেশ্বরম ও শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপের মাঝের সমুদ্র অঞ্চলে অগভীর জল, বালির চর এবং চুনাপাথরের গঠন রয়েছে। এই ধারাবাহিক গঠনকেই সাধারণত অ্যাডামস ব্রিজ বা রামসেতু বলা হয়। উপগ্রহচিত্রে এই অঞ্চল স্পষ্ট দেখা যায়।
তবে কোনও গঠন উপগ্রহ থেকে দেখা গেলেই তার নির্মাতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। ছবি থেকে একটি এলাকার আকৃতি বোঝা সম্ভব। কিন্তু শুধু ছবি দেখে সেই গঠন কত বছরের পুরনো, কে সেটি তৈরি করেছে কিংবা তার মধ্যে মানুষের কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায় না।
নাসা কি রামসেতুকে মানুষের তৈরি বলে স্বীকার করেছে?
নাসার প্রকাশিত ছবিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝের এই ভৌগোলিক গঠন দেখা যায়। তবে ছবি দেখিয়ে একে রামচন্দ্রের বানরসেনার তৈরি সেতু বলে চিহ্নিত করা হয়নি। এই গঠনের উৎপত্তি ও ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। তাই ‘নাসা রামসেতুকে মানবনির্মিত বলেছে’ এমনটাও ভাবার কোনও কারণ নেই।