অবসর ঘোষণা রোনাল্ডোর পর্তুগালের জার্সিতে আর দেখা যাবে না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ইতি টানার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন ভিডিয়ো বার্তায় জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করেছেন ৪১ বছর বয়সি রোনাল্ডো। নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পরই পর্তুগালের হয়ে তাঁর যাত্রা শেষ হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। দেশের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচে ১৪৬টি গোল, একাধিক ট্রফি এবং অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে বিদায় নিতে চলেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা।
পর্তুগালের মানুষের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় রোনাল্ডো জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর কাছে সহজ ছিল না। জাতীয় দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে। দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যে শুধু ফুটবল খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাঁর কাছে ছিল গর্ব ও দায়িত্বের বিষয়, সেটাও জানিয়েছেন তিনি।
রোনাল্ডোর কথায়, জাতীয় দলের হয়ে মাঠে তাঁর যাত্রা এবার শেষের পথে। মাথা উঁচু করেই বিদায় নিতে চান তিনি। পর্তুগালের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন এই তারকা। তাঁর কথায়, ৭ নম্বর জার্সি অন্য কারও হাতে গেলেও সেই জার্সি গায়ে চাপানোর গর্ব তাঁর সঙ্গেই থেকে যাবে। পর্তুগাল চিরকাল তাঁর হৃদয়ে থাকবে।
কোচের সঙ্গে বিতর্কের পরই অবসরের সিদ্ধান্ত?
রোনাল্ডোর অবসরের ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন পর্তুগাল জাতীয় দলের কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যান রোনাল্ডো। তার পর থেকেই তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত নেশনস লিগে নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচকে কেন্দ্র করে। সেই ম্যাচে রোনাল্ডোকে প্রথম একাদশে তো বটেই, পরিবর্ত হিসেবেও মাঠে নামাননি কোচ জর্জ জেসুস। রোনাল্ডোর দাবি ছিল, তাঁকে ৩০ মিনিট খেলার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন কোচ। কিন্তু পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। রোনাল্ডোর মতে, এতে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে।
এর পর ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে পর্তুগালের জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে চলে যান তিনি। যদিও জর্জ জেসুস জানিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কোনও সংঘাত হয়নি। দলের প্রথম একাদশ বা পরিবর্ত নির্বাচন করা সম্পূর্ণ কোচের দায়িত্ব বলেও স্পষ্ট করেছিলেন তিনি।
পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন রোনাল্ডো। সতীর্থ এবং পর্তুগালের সমর্থকদের কাছে ক্ষমাও চান। একই সঙ্গে জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাঁকে শাস্তি দিলেও তা মেনে নেবেন বলে জানিয়েছিলেন। সেই ঘটনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অবসরের ঘোষণা করলেন তিনি।
পর্তুগালের হয়ে রোনাল্ডোর কেরিয়ার একনজরে
২০০৩ সালের অগাস্টে কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল রোনাল্ডোর। তার পর দীর্ঘ ২৩ বছরে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন তিনি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি সর্বাধিক গোলের রেকর্ডও তাঁর দখলে।
পর্তুগালের হয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলি হল:
ইউরো ২০১৬: রোনাল্ডোর নেতৃত্বে প্রথমবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে পর্তুগাল।
নেশনস লিগ ২০১৯: প্রথমবার আয়োজিত উয়েফা নেশনস লিগের খেতাব জেতে পর্তুগাল।
নেশনস লিগ ২০২৫: দ্বিতীয়বার এই প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন হয় পর্তুগাল। সেই দলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রোনাল্ডোর।
আন্তর্জাতিক গোল: পর্তুগালের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচে ১৪৬টি গোল। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক গোলের রেকর্ড।
আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ২৩৪টি ম্যাচ খেলে পুরুষদের ফুটবলে সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার নজির।
বিশ্বকাপ: ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ-সহ মোট ছয়টি বিশ্বকাপের আসরে গোল করার নজির গড়েছেন তিনি।
জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হতে চললেও ক্লাব ফুটবলে রোনাল্ডোর লক্ষ্য এখনও বাকি। সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে খেলছেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে কেরিয়ারে ১,০০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়ার কাছাকাছি রয়েছেন পর্তুগিজ তারকা। সর্বশেষ পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট গোলসংখ্যা ৯৭৯।
২০০৩ সালে যে ৭ নম্বর জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই জার্সি এবার তুলে রাখার সময় এসেছে। পর্তুগালের হয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ হলেও দেশের ফুটবল ইতিহাসে রোনাল্ডোর জায়গা যে দীর্ঘদিন অক্ষত থাকবে, তা বলাই যায়।