
আদ্যান্ত একপেশে ম্যাচ। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালের (FIFA World Cup 2026 Final) এটাই নির্যাস। একই সঙ্গে স্পেন আবার প্রমাণ করল, ফুটবল টিম গেম। যতই বড় তারকা থাকুন দলে, দলগত না খেললে সাফল্য আসবে না। রবিবার মধ্যরাতে চোখ জ্বালা করে যাঁরা ম্যাচ দেখলেন, কলকাতার হাজার হাজার আর্জেন্টিনা ভক্ত, ভোররাতে যেন শ্মশানের স্তব্ধতা। কারও চোখে জল। কেউ একরাশ হতাশা নিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে। এবং এটাও ঠিক, মার্টিনেজের মতো গোলকিপার না থাকলে আরও একাধিক গোল খেতে হত আর্জেন্টিনাকে।

স্পেনের এই সাফল্য জুনিয়র স্তরের ফুটবল উন্নয়ন, কোচদের জন্য একীভূত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে উন্নত টেকনিক্যাল ট্রেনিং এবং সব বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের জন্য একই ধরনের খেলার দর্শনের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করল। এই দর্শনের মূল ভিত্তি হল, কৌশলগত বোধ, নিখুঁত কারিগরি দক্ষতা এবং বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল। স্পেনের জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সেই ফুটবল দর্শনেরই আধুনিক রূপ, যার ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছিল তিন দশকেরও বেশি আগে।

ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ ব্যবধানে জয় দেখে ম্যাচটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ছিল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে গোটা ম্যাচেই আধিপত্য ছিল স্পেনের। অবাক করার মতো বিষয়, পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা একটিও শট লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। বলের দখল ৬৫ শতাংশ সময় ছিল স্পেনের কাছে। পাশাপাশি তারা সফলভাবে ৭৬২টি পাস সম্পন্ন করে, যেখানে আর্জেন্টিনার সফল পাসের সংখ্যা ছিল ৩৫৮টি।

কলকাতা সহ গোটা বাংলায় জেলায় জেলায় জায়ান্ট স্ক্রিনে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ব্রাজিলের বিদায়ের পরে পশ্চিমবঙ্গে আপামর ফুটবলপ্রেমীর মন ছিল আর্জেন্টিনার দিকেই। লিওনেল মেসির জাদু দেখবে বলে রাত জাগল কলকাতা। কিন্তু ম্যাচ যতই এগোতে থাকল, ততই বোঝা গেল, দিনটা স্পেনের।

ফাইনালে স্পেন আগের ম্যাচের একই একাদশ ধরে রেখেই মাঠে নামে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা প্রথম একাদশে তিনটি পরিবর্তন আনে। মিডফিল্ডে ফিরে আসেন রদ্রিগো দে পল, ডান দিকের ফুল-ব্যাক হিসেবে শুরু করেন গনসালো মন্তিয়েল এবং উইংয়ে সুযোগ পান নিকোলাস গনসালেস। বেঞ্চে চলে যান জুলিয়ানো সিমেওনে, নাহুয়েল মোলিনা এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেস।

ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই ১৯ বছরের লামিন ইয়ামাল একটি দারুণ সুযোগ তৈরি করেন। কয়েক মুহূর্ত পরই তিনি আরও একটি সুযোগ তৈরি করেন। স্পেনের এই শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের জবাবে পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে আর্জেন্টিনা। তবে মাঝমাঠের কাছেই স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোন সেই আক্রমণ ভেস্তে দেন।

শুরুতেই ম্যাচের চিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়, স্পেন বলের দখল রেখে খেলা নিয়ন্ত্রণ করবে, আর আর্জেন্টিনা সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করবে। হাইড্রেশন ব্রেক পর্যন্ত ম্যাচের প্রথম ২৫ মিনিট ছিল বেশ সতর্ক ও মাপা লড়াই। তবে ডান প্রান্তে লামিন ইয়ামাল বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে সমস্যার সৃষ্টি করছিলেন।

এরপর আর্জেন্টিনা ডিফেন্স আরও বাড়িয়ে স্পেনকে সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ দেয়। বাঁ প্রান্তে মার্ক কুকুরেয়া ক্রমশ আক্রমণে উঠে আর্জেন্টিনার ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন। ৩৮তম মিনিটে গোল করার দারুণ সুযোগও পেয়েছিলেন মিকেল ওয়ারসাবাল।

প্রথমার্ধের শেষে পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, একমাত্র ফাউলের সংখ্যাতেই এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। যদিও পুরো প্রথমার্ধে মাত্র একটি হলুদ কার্ড দেখানো হয়, সেটি পান আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। তবে চোট পাওয়ায় কিছুক্ষণ পর তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয় এবং তাঁর বদলে নামেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি।

এক্স্ট্রা টাইমে ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠের কাছে এমিলিয়ানো ফার্নান্দেজ বেপরোয়া ট্যাকল করেন। আগে থেকেই একটি হলুদ কার্ড দেখেছিলেন তিনি। ফলে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন এবং ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। তখনই চাপে যেন ভেঙে পড়ল আর্জেন্টিনা।

এরপর আর্জেন্টিনার সামনে বিশ্বকাপ জেতার একমাত্র পথ ছিল ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া। আর তা করতে হলে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপিং পারফর্ম্যান্স উপহার দিতে হত। একই সঙ্গে স্পেনকেও একের পর এক সুযোগ নষ্ট করতে হতো। ৯৫তম মিনিটে স্পেন আরও দুই পরিবর্ত খেলোয়াড়কে মাঠে নামায়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিকো উইলিয়ামস বল জালে জড়ান। কিন্তু অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। এরপর ১০৩তম মিনিটে বদলি হিসেবে নামা মিকেল মেরিনো সম্পূর্ণ ফাঁকা অবস্থায় হেডে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন।

অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম মিনিটেই অচলাবস্থা ভাঙেন ফেরান তোরেস। তাঁর গোলে এগিয়ে যায় স্পেন এবং কার্যত তখনই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সময় পর্যন্ত স্পেন গোলের উদ্দেশে ২০টি শট নিয়েছিল, আর আর্জেন্টিনা একটিও নিতে পারেনি। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে এদিন প্রায় নিষ্প্রভই দেখিয়েছে। ম্যাচের শেষদিকে দুটি কর্নার থেকে কিছুটা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছাড়া তিনি কার্যত দর্শকই ছিলেন।