ষষ্ঠীর দিন চাঁদ সবচেয়ে দূরে সরে যাবে
আকাশে জ্বলজ্বলে চাঁদ প্রতি মাসে কাছে আসে এবং দূরে সরে যায়। এর কক্ষপথ পুরোপুরি গোলাকার নয়, বরং উপবৃত্তাকার। তাই, কখনও চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে, যাকে বলা হয় পেরিজি, এবং কখনও সবচেয়ে দূরে চলে যায়, যাকে বলা হয় অ্যাপোজি। এই শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬-এ, চাঁদ পৃথিবী থেকে তার সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানে থাকবে। এই দূরত্ব হবে আনুমানিক ৪,০৩,৯৪৫ কিলোমিটার। চাঁদের সঙ্গে পৃথিবীর গড় দূরত্ব প্রায় ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার। এখন প্রশ্ন হলো, চাঁদ যখন এতদূর সরে আসবে তখন পৃথিবীর উপর এর কী প্রভাব পড়বে? সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
চাঁদ সরে গেলে জোয়ার-ভাটার উপর প্রভাব
সমুদ্রের জলের উপর চাঁদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে। চাঁদ তার মহাকর্ষীয় শক্তি দিয়ে সমুদ্রের জলকে আকর্ষণ করে। এর ফলে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা হয়। চাঁদ যখন কাছে থাকে, তখন এই আকর্ষণ কিছুটা বেশি শক্তিশালী হয়, যার ফলে উচ্চ জোয়ার হয়। চাঁদ যখন দূরে থাকে, তখন এই আকর্ষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই শুক্রবার, চাঁদের দূরত্বের কারণে জোয়ার-ভাটা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়বে। জোয়ার ও ভাটার মধ্যে পার্থক্য কয়েক সেন্টিমিটার কমে যেতে পারে। সমুদ্রতীরে বসবাসকারী মানুষ খুব বেশি পার্থক্য লক্ষ্য করবেন না, কারণ এই পরিবর্তন খুবই সামান্য। তবে আবহাওয়া এবং বাতাসের উপর এর প্রভাব অনেক বেশি থাকবে। তবে জেলে এবং নাবিকদের যথারীতি কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
চাঁদ যখন দূরে থাকে, তখন আকাশে এটিকে কিছুটা ছোট এবং কম উজ্জ্বল দেখায়। সেদিন যদি পূর্ণিমা থাকত, তবে তাকে মাইক্রোমুন বলা হত, কিন্তু সব পূর্ণিমা অ্যাপোজি অবস্থানে হয় না। সাধারণ মানুষ খালি চোখে খুব বেশি পার্থক্য লক্ষ্য করবেন না, কারণ এই পরিবর্তন মাত্র ১০-১৪ শতাংশ। ফটোগ্রাফে বা টেলিস্কোপের মাধ্যমে সামান্য পার্থক্য দেখা যেতে পারে। রাতে চাঁদকে কিছুটা কম উজ্জ্বল মনে হবে, কিন্তু আলো এতটা ক্ষীণ হবে না যে চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যাবে।
চাঁদ যদি চিরতরে হারিয়ে যায় তাহলে কী হবে?
এই মুহূর্তে চাঁদ মাত্র কয়েক দিনের জন্য দূরে সরে যাচ্ছে। তারপর এটি ফিরে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চাঁদ যদি ধীরে ধীরে চিরতরে দূরে সরে যেতে থাকে, তাহলে পৃথিবীতে কী কী বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে? বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, চাঁদ প্রতি বছর প্রায় ৪ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে। এটি একটি অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়া। এর প্রভাব লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি বছর পরে দৃশ্যমান হবে। চাঁদ যদি দূরে সরে যায় তাহলে জোয়ার-ভাটা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে সমুদ্রে পুষ্টির সরবরাহ কমে যেতে পারে, যা মাছ এবং সামুদ্রিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষত অনেক জীবের জীবনচক্র চাঁদের আলো এবং জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। এতে মাছের ডিম পাড়া বা পাখিদের পরিযায়ী হিসেবে পথ চলা প্রাভাবিত হতে পারে।
চাঁদ পৃথিবীর অক্ষকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। চাঁদ যদি খুব বেশি দূরে সরে যায়, তাহলে পৃথিবীর অক্ষ আরও বেশি টলমল করবে। এর ফলে ঋতু পরিবর্তন হতে পারে। কখনও খুব গরম, কখনও খুব ঠান্ডা হতে পারে। আবহাওয়া অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। দিনের দৈর্ঘ্যও ধীরে ধীরে বাড়তে পারে, কারণ চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি কমিয়ে দেয়। বর্তমানে এক দিন ২৪ ঘণ্টায় হয়, চাঁদ আরও দূরে সরে গেলে দিনগুলো আরও দীর্ঘ হতে পারে।
গ্রহণের উপরও প্রভাব?
সূর্যগ্রহণও কমে যাবে বা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাবে, কারণ চাঁদকে ছোট দেখাবে এবং এটি সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে কম সক্ষম হবে। রাত আরও অন্ধকার হয়ে যাবে। কিন্তু এটা লক্ষ লক্ষ বছরের ব্যাপার। আপাতত, চিন্তার কোনA কারণ নেই।
সাধারণ মানুষের কী করা উচিত?
এই শুক্রবার আকাশ পরিষ্কার থাকলে চাঁদের দিকে তাকান। এটিকে ছোট দেখাবে, কিন্তু তবুও সুন্দরই থাকবে। সমুদ্রের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের প্রতিদিনের মতোই সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। বিজ্ঞানীরা লেজার এবং স্যাটেলাইট ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত চাঁদের দূরত্ব পরিমাপ করেন। এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক। এটি প্রতি মাসেই ঘটে। প্রসঙ্গত, চাঁদ পৃথিবীর সঙ্গী। এটি শুধু রাতের আকাশকেই আলোকিত করে না, বরং জোয়ার-ভাটা, আবহাওয়া এবং জীবনকেও প্রভাবিত করে। এবার দূরে সরে গেলে চাঁদের আকার কিছুটা ছোট দেখাবে। বাকি সবকিছু স্বাভাবিক থাকবে। প্রকৃতির এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো বোঝা আমাদের বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করে।