Sindoor Row: সিঁদুর কি শুধুই স্বামী থাকার প্রতীক? রূপা-পল্লবীদের নিয়ে চর্চায় কী ব্যাখ্যা পুরাণবিদের...

রূপা বা পল্লবী কিংবা রেখা এঁরা স্পষ্টই জানিয়েছেন যে তাঁদের ভাল লাগে তাই তাঁরা সিঁদুর পরেন। অথচ সিঁদুরকে হিন্দু ধর্মে বিবাহিত মহিলাদের প্রতীক হিসাবেই ধরা হয়। তাহলে কীভাবে ডিভোর্সি কিংবা বিধবা মহিলা সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারেন?

Advertisement
সিঁদুর কি শুধুই স্বামী থাকার প্রতীক? রূপা-পল্লবীদের নিয়ে চর্চায় কী ব্যাখ্যা পুরাণবিদের... রূপা-পল্লবীর সঙ্গে ইনসেটে পুরাণবিদ সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়
হাইলাইটস
  • রূপা বা পল্লবী কিংবা রেখা এঁরা স্পষ্টই জানিয়েছেন যে তাঁদের ভাল লাগে তাই তাঁরা সিঁদুর পরেন।

বিচ্ছেদ হওয়া সত্ত্বেও কার নামে এখনও সিঁথিতে সিঁদুর ছোঁয়াচ্ছেন রূপা? ডিভোর্স হওয়ার পরও কেন এখনও সিঁদুর পরেন পল্লবী চট্টোপাধ্যায়? রেখার সিঁথিতেও সব সময় জ্বলজ্বল করে সিঁদুর। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি বহু সময়ই এই তারকাদের হতে হয়েছে। সোশাল মিডিয়াতেও এই নিয়ে চর্চা রয়েছে। রূপা বা পল্লবী কিংবা রেখা এঁরা স্পষ্টই জানিয়েছেন যে তাঁদের ভাল লাগে তাই তাঁরা সিঁদুর পরেন। অথচ সিঁদুরকে হিন্দু ধর্মে বিবাহিত মহিলাদের প্রতীক হিসাবেই ধরা হয়। তাহলে কীভাবে ডিভোর্সি কিংবা বিধবা মহিলা সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারেন? এই সিঁদুর-তত্ত্ব নিয়েই bangla.aajtak.in-এর সঙ্গে কথা বললেন পুরাণবিদ সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শাস্ত্রে সিঁদুরের উল্লেখ রয়েছে?
সিঁদুর কোনও শাস্ত্রীয় উপাদান নয়। প্রাচীন শাস্ত্র কিংবা বৈদিক গ্রন্থে সিঁদুরের উল্লেখ নেই। টিভিতে রামায়ণ সিরিয়ালে সীতাকে যতই চওড়া করে সিঁদুর পরানো হোক না কেন, বাল্মিকী রামায়ণের কোথাও সিঁদুরের কথা উল্লেখ করা নেই। মহাভারতে দ্রৌপদীর পাঁচ-পাঁচটা বিয়ে, কিন্তু সেখানেও কোথাও সিঁদুরের গল্প নেই। মহাভারত পিরিয়ড সহ একাধিক প্রাচীন পুরাণগুলিতেও সিঁদুরের কোনও কথা বলা নেই। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে যে সিন্ধু সভ্যতার যে নারীমূর্তি, তাঁদের মাথায় সিঁদুর এল কোথা থেকে? এটা মাথায় রাখতে হবে আমাদের এখানকার যে সিন্ধু সভ্যতার যে দ্রাবিড় জনজাতি, তাঁদের মধ্যে আগে থেকে হয়ত এই সিঁদুরের চল ছিল। কিন্তু বৈদিক সংস্কৃতিতে সিঁদুরের প্রচলন খুব একটা ছিল না। গুপ্ত পিরিয়ড পর্যন্ত তো নেই। 

কবে থেকে শুরু সিঁদুরের ব্যবহার?
সিঁদুরের ব্যবহার মোটামুটি ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দী (6th and 7th Century AD)-তে প্রসাধনী হিসাবেই শুরু হয়েছিল, শুধুমাত্র সাজার উপাদান। মনে করা হয় যে আমাদের এখানকার যে পার্বত্য জনজাতি হিসাবে যারা ছিল, তারাই প্রথম এই সিঁদুর ব্যবহার করতো। তাঁদের কাছ থেকেই বিষয়টি আর্যায়িত হয়ে যায়। তাই আজ যে বিবাহিত মহিলাদের কাছে সিঁদুর একটা প্রতীক হয়ে উঠেছে, সেটা কিন্তু অনেক দেরিতে। আসলে দশম শতাব্দীর পর মুসলিম মেয়েদের খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে যেত আর বিধবা মহিলাদের সাজগোজের ব্যাপার ছিল না সেই সময়। তাই বিধবারা কিছুই পরবে না, সাজগোজ করবে না থেকে সিঁদুরটা শুধুমাত্র বিবাহিতদের প্রতীক হয়ে যায়। সেটা মুসলিম শাসনের সময় আরও বেশি করে। 

Advertisement

ছবি সৌজন্যে: ফেসবুক

সিঁদুরের উল্লেখ পাওয়া যায় বৌদ্ধ সংস্কৃতিতেও
এই মেটে সিঁদুর বা লাল সিঁদুর এর ব্যবহার বর্তমান পাকিস্তানের বালুচিস্তানে যেখানে হিঙ্গলাজের মন্দির আছে, সেখানে এক ধরনের পাথর দিয়ে সিঁদুর তৈরি হয়, তাকে হিঙ্গুল বলে এবং আমাদের হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো বিখ্যাত ভাষাবিদ উল্লেখ করেছিলেন যে সিঁদুর শব্দটা ভোটবর্মী শব্দ হতে পারে। এছাড়াও হিউয়ান সাং-এর রচনায় এবং অন্য সব চাইনিজ লেখায় এই সিঁদুরের কথা পাওয়া যায়, কিন্তু ওরা উচ্চারণ করে সিন্টুন (Tsintun)। এই ধরনের লাল পাউডার তিব্বতে পাওয়া যায়। তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের সংস্কৃতিতে এই সিঁদুরকে প্রসাধনী হিসাবেই ব্যবহার করা হয় আর এই সংস্কৃতি থেকে বৌদ্ধ তন্ত্রে যেহেতু সিঁদুরের ব্যবহার আছে, এখানকার শাক্ত তন্ত্রেও সিঁদুরের ব্যবহার রয়েছে, মানে দেবীর মাথায় সিঁদুর দেওয়া এইসব ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পায়। সেটা সপ্তম শতাব্দীর অনেক পরেই। 

প্রসাধনী হিসাবে যে কেউ পরতে পারেন
তাই এখন যদি রেখা, পল্লবী চট্টোপাধ্যায় কিংবা রূপা গঙ্গোপাধ্যায় স্বামী না থাকতেও যদি সিঁদুরকে প্রসাধনী হিসাবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে প্রাচীন ভারতের নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত হাজার তেরশো বছর আগে পর্যন্ত আমাদের যে সংস্কৃতি ছিল, সেই অনুযায়ী কোনও সমস্যা নেই। ঠোঁটের লিপস্টিক আর মাথায় একটা সিঁদুর ব্যস। তাই যে কেউ পরতে পারে। হেয়ার কালার ফ্যাশন হলে, সিঁদুর পরাটা কেন নয়? সিঁদুরকে জনপ্রিয় করে তুলেছে একতা কাপুরের সিরিয়াল। অনেক বছর আগেও আমাদের এখানে ট্রেন্ড ছিল যে আধুনিকা মেয়েরা সিঁদুর পরত না, ব্রাহ্ম মহিলারা সিঁদুর পরত না। ফলে এখন সিঁদুর ট্রেন্ডে চলছে, সেটা টিভি সিরিয়ালের জন্য বা ফ্যাশন ট্রেন্ডের জন্য কিংবা রেখাকে দেখে, তাতে কোনও অসুবিধা নেই। তাতে শাস্ত্রীয় কোনও বাধাও নেই। তাই সধবা থেকে বিধবা সকলেই সিঁদুর পরতে পারেন প্রসাধন হিসাবেই। তাই যাঁরা সাজগোজ করতে ভালোবাসেন, তাঁরা ফ্যাশন সিম্বল হিসাবে যা খুশি ব্যবহার করতে চান, করতে পারেন। কারণ সিঁদুর আমাদের শাস্ত্রীয় জিনিস কোনওদিন ছিল না। সিঁদুর আমাদের শাস্ত্রীয় জিনিস হয়েছে হাজার বছরও নয়। 

ছবি সৌজন্যে: সংগৃহীত

বিবাহিত নারীদের প্রতীক কীভাবে হল?
ইসলামিক যুগে অনেক ছোট বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত, তারা তো সাজগোজের কিছুই বুঝতো না আর বিধবাদেরও সাজের কোনও নিয়ম ছিল না। তাই সিঁদুর বিবাহিত নারীদের প্রতীক হয়ে গেল। কারোর মাথায় সিঁদুর দেখলে বোঝা যেত যে সে সধবা। ওই পার্থক্যটা দেখানোর জন্যই এই সিঁদুরের চল। অনেকে আবার সিঁদুরকে পুরুষতান্ত্রিক জিনিস বানিয়ে দিয়েছেন আর সেই বিষয়টিকে ভাঙতে চাইছেন বর্তমান যুগের মহিলা পুরোহিতরা বা এমন চালু করতে চাইছে যে বর-বউ দুজনেই সিঁদুর পরবে। 

বিয়েতে সিঁদুরদান না করলেও চলবে
এক সময় যখন বরও বউকে সিঁদুর পরাতো, যখন সিঁদুর পরানো শুরু হয়েছিল, সেটাও প্রসাধনী হিসাবে আদর করে। সিঁদুর দান কোনও শাস্ত্রীয় আচার নয়, রোম্যান্টিক স্ত্রী আচার। বউকে মাথায় ফুল লাগিয়ে দেওয়া যদি রোম্যান্টিক বিষয় হতে পারে, তাহলে সিঁদুর দান বিষয়টিও হাজার বছর আগে সেখান থেকেই এসেছে। সিঁদুর দানের সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। সিঁদুরকে কোনওভাবেই পুরুষতান্ত্রিকতা বা সাবেকিয়ানার প্রতীক বলে তোল্লাই দেওয়া উচিত নয়, আধুনিক সংস্কৃতিতে মানুষ যা পারে পরুক। তাই পল্লবী চট্টোপাধ্যায় বা রেখার সিঁদুর পরা নিয়ে যেমন কোনও সমালোচনা করব না তেমনি কোনও বিবাহিত নারী সিঁদুর না পরলেও তাদের জন্য কোনও বিদ্বেষ নেই।  আমাদের হিন্দু সংস্কৃতি বরাবর খুব উদার থেকে এসেছে। সিঁদুর পরা না পরা একটা প্রসাধনীর অঙ্গ, কেউ চাইলে পরতে পারেন আর কেউ না চাইলে পরবেন না, এমনকী বিয়ের সময়ও সিঁদুর দান না করলেও হবে। আর সিঁদুর খেলা তো আমাদের কাছে দোল উৎসবের মতো, এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনও বিষয় নেই। তাই প্রসাধনীর জায়গাতেই সিঁদুর থাক, একে কালচারাল গোঁড়ামিতে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে নন পুরাণবিদ সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, প্রাচীন গ্রন্থে কোথাও এটা নেই এবং হিন্দু সভ্যতার মহিলাদের কাছে এটা প্রসাধনী ছিল বরাবর।   

Advertisement

POST A COMMENT
Advertisement