এসি ব্যবহারের নিয়ম যে হারে গরম পড়ছে, তাতে বাইরে বেরলে সকলেরই নাজেহাল অবস্থা। একটুতেই দরদর করে ঘামছেন মানুষ, যেন কেউ শরীরে জলের কল খুলে দিয়েছে! এই হাঁসফাঁস পরিস্থিতিতে এসি-ই (AC) আমাদের পরম বন্ধু। বাড়ি হোক বা অফিস, বাইরের প্যাচপ্যাচে গরম থেকে বাঁচতে অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে এসি চালিয়ে দেন। কিন্তু ভুল করে কেউ যদি এসির সঙ্গে সিলিং ফ্যানটাও চালিয়ে দেন, অমনি বাকিরা রে রে করে ওঠেন! তড়িঘড়ি ফ্যান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আসলে অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা, ফ্যান চালালে এসির ঠান্ডা হাওয়া নাকি এ দিক-ও দিক ছড়িয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এসি আর ফ্যান একসঙ্গে চালানো নিয়ে এই তর্ক বহু দিনের। আপনিও কি তাই ভাবেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনি একেবারেই ভুল। জেনে রাখা ভাল, ঘরের সিলিং ফ্যান আর এসি একে অপরের পরিপূরক। সঠিক নিয়মে এই দু’টি একসঙ্গে চালালে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হয়, অনেকক্ষণ ঠান্ডা থাকে, এমনকি বিদ্যুতের বিলও চোখে পড়ার মতো কম আসতে পারে।
গোটা ঘরে এসির হাওয়া ছড়িয়ে দেয় ফ্যান
সাধারণ মানুষের ধারণা ফ্যান এসির হাওয়া নষ্ট করে দেয়, কিন্তু বাস্তবটা ঠিক উল্টো। শুধু এসি চললে ঠান্ডা হাওয়া সাধারণত ঘরের একটি অংশেই আটকে থাকে বা ভারী হয়ে নীচের দিকে বসে যায়। কিন্তু এসির সঙ্গে ফ্যান চালালে সেই ঠান্ডা হাওয়া দ্রুত সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর ফলে ঘরের প্রতিটি কোণ খুব তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যায়। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বিশেষ করে বড় ঘরে এসির সঙ্গে ফ্যান চালানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
এসির তাপমাত্রা খুব কমানোর প্রয়োজন হয় না
গরম বেশি থাকলে অনেকেই এসি ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চালিয়ে দেন, যাতে ঘর তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়। কিন্তু ফ্যান চললে এসির তাপমাত্রা এতটা কমানোর কোনও দরকারই পড়ে না। ফ্যানের কারণে ঠান্ডা হাওয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তাই ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও আপনি সমান আরাম বোধ করবেন। এতে এসির উপর বেশি চাপ পড়ে না এবং যন্ত্রটি দীর্ঘ দিন ভাল থাকে।
ফ্যান কি সত্যিই ঘর ঠান্ডা করে?
অনেকেই ভাবেন ফ্যান বাতাসকে ঠান্ডা করে। কিন্তু বিজ্ঞানের মতে বাস্তবে তা হয় না। ফ্যান আসলে আমাদের শরীরের ঘাম দ্রুত শুকিয়ে দেয় এবং ত্বকে বাতাসের প্রবাহ বা 'এয়ার ফ্লো' বাড়ায়। ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার কারণেই আমরা ঠান্ডা অনুভব করি। সোজা কথায়, ফ্যান তাপমাত্রা কমায় না, বরং গরমের অনুভূতিটা কমিয়ে দেয়।
ফ্যান কখন কাজ করে না?
এসির সঙ্গে ফ্যান চালানো লাভজনক হলেও, কিছু ক্ষেত্রে ফ্যানের প্রভাব কম হতে পারে। বাতাসে আর্দ্রতা বা হিউমিডিটি খুব বেশি থাকলে শুধু ফ্যান চালালে প্যাচপ্যাচে অস্বস্তি দূর হয় না। এর পাশাপাশি, সারা রাত ফুল স্পিডে ফ্যান চালালে অনেকের চোখ, গলা বা নাকে শুষ্ক ভাব দেখা দিতে পারে। তাই এসির সঙ্গে ফ্যানের স্পিড ‘লো’ বা ‘মিডিয়াম’-এ রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক।
বিদ্যুতের বিলও কমতে পারে ম্যাজিকের মতো
এসির সঙ্গে ফ্যান চালালে বিদ্যুতের বিলও সাশ্রয় হতে পারে। আপনি যদি এসির তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ফ্যান ব্যবহার করেন, তবে বেশ খানিকটা বিদ্যুৎ বাঁচবে। মনে করা হয়, এসির তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি বাড়ালে প্রায় ৩% পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
অর্থাৎ, আপনি যদি ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বদলে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এসি চালান এবং সঙ্গে হালকা করে ফ্যান চালিয়ে দেন, তবে মাসের শেষে ইলেকট্রিক বিলে বড়সড় পার্থক্য দেখতে পাবেন।
সব মিলিয়ে, আপনি যদি চান ঘর দ্রুত ঠান্ডা হোক, এসির উপর চাপ কম পড়ুক আর বিদ্যুতের বিলও সাধ্যের মধ্যে থাকুক— তবে এসির সঙ্গে ফ্যান চালানোটা নিঃসন্দেহে একটি ‘স্মার্ট চয়েস’। শুধু খেয়াল রাখবেন, ফ্যানের স্পিড যেন খুব বেশি না হয় এবং এসির তাপমাত্রাও যেন অকারণে কমিয়ে না রাখা হয়।