অন্যের প্রেমের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই অকারণে অশান্তি ডেকে আনছেন।গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড অফিস বা বন্ধুদের আড্ডার মাঝে ফোন করছেন না? জন্মদিনে দামি উপহার দিচ্ছেন না? হাঁটু গেড়ে হাতে আংটি পরিয়ে দিচ্ছেন না? রাগের মাথায় খারাপ কথা বলে ফেলছেন? তাহলে ব্রেক আপ করে নিন। ইউ ডিজার্ভ বেটার। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন নানা ভিডিও দেখার পর নিজের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন জাগতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিওর সাজানো প্রেমের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই অকারণে অশান্তি ডেকে আনছেন। হারাচ্ছেন ভাল মানুষকে। আবার অনেকে রিলের মতো সাজানো প্রেমের নাটক করা পুরুষ-মহিলার পাল্লায় পড়ে বোকাও বনছেন।
ইনস্টাগ্রাম রিলস থেকে ফেসবুকের ভিডিয়ো, সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে প্রেমের নানা পরামর্শ। কোনও ভিডিয়োয় বলা হচ্ছে, সত্যিই ভালবাসলে সঙ্গী নিজে থেকেই সব করবেন। অফিসে গেলেও সময় বের করে ফোন করবেন। কোথাও আবার 'প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট'-এর কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রেমিক বা প্রেমিকাকে রীতিমতো রাজকুমারী বা রাজকুমারের মতো 'প্যাম্পার' করতে হবে। অন্যদিকে, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে দামি উপহার, বিদেশে বেড়াতে যাওয়া কিংবা সিনেমার মতো রোম্যান্টিক মুহূর্ত কাটাচ্ছেন কাপলরা। সবই স্ক্রিপ্ট লিখে, ভিডিওর ভিউ আনা ও টাকা ইনকামের কথা মাথায় রেখে বানানো। অথচ, এই সব দেখে অনেকেই নিজের সম্পর্ক নিজেই জাজ করতে শুরু করেছেন। প্রেমিক বা প্রেমিকাকে রীতিমতো Hate করছেন। ভাবছেন, 'এ তো এফর্টই দেয় না। অছেদ্দা করে!' অন্যদিকে কেউ রিলের মতো কাজ করলেই কারও প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করে দিচ্ছেন। মানুষটি আদতে কেমন, তা ভাবছেন না।
মনগড়া কথা নয়, রেজিস্টার্ড সার্ভে-ই এটা বলছে
সম্প্রতি ডেটিং অ্যাপ QuackQuack একটি সমীক্ষা চালায়। তাতেই এই বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন শহরের ২২ থেকে ৩৮ বছর বয়সি ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছিল। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া দেখে নিজের প্রেম জীবনে খাটাতে গিয়ে অনেকেই ঠকেছেন। ভাল মানুষ খুইয়েছেন অনেকেই। পরে ভুল বুঝেছেন। বুঝতে পেরেছেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ছবি বাস্তবে খাটে না।
সমীক্ষায় ২৫ বছরের বেশি বয়সি ৪,৬৯৪ জনের মধ্যে অনেকে জানিয়েছেন, প্রত্যেক সম্পর্ক আলাদা। তাই সবার জন্য একই নিয়ম হতে পারে না। প্রায় ৬০ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, কাজের পরে কিছুটা একা থাকতে চাওয়া মানেই আবেগহীন হওয়া নয়। আবার ৩৮ শতাংশের মতে, দামি বা জাঁকজমকপূর্ণ ডেটের আয়োজন করতে না পারলেই কাউকে কম কেয়ারিং বলা যায় না। কোনও পুরুষ-মহিলাই শিশু নন। ভালবাসা মানেই সঙ্গীকে সব সময় ছোটদের মতো আগলে আগলে রাখতে হবে, সেটাও বাস্তবসম্মত নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ কাপলরাও শুধুমাত্র নিজেদের সুন্দর মুহূর্তের ভিডিও-ছবিই শেয়ার করেন। বাস্তবে তাঁরাও ঝগড়া করেন, রাগের মাথায় খারাপ কথা বলে ফেলেন, ক্ষমা চান, কথা বন্ধ থাকে, অশান্তি হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলি না দেখে সবাই সোশ্যাল মিডিয়ায় খালি সুন্দর মুহূর্তগুলিই দেখেন। আর তা দেখে ধারণা হয়, আমার বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডই খারাপ। বাকি সবাই কত ভাল আছে!
QuackQuack-এর সিইও রবি মিত্তল জানিয়েছেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের পরিস্থিতি বোঝা খুব জরুরি। একটি ভিডিয়োয় যে পরামর্শ ভাল শোনায়, তা নিজের জীবনে অন্ধভাবে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। উল্টোদিকের মানুষটি কোন মানসিক অবস্থায় আছেন, বা ব্যস্ত আছেন কিনা না বুঝেই তাঁর ফোন চাওয়াটা বাস্তবসম্মত নয়।
কী করবেন?
সমস্যা হল, অনেকেই জানেন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানো প্রেমের মুহূর্ত ভিডিও বানানোর জন্যই সাজানো। তবুও নিজের সম্পর্কের সঙ্গে সাবকনসাসে তুলনা করে ফেলেন। এমন ভিডিও এলে চেষ্টা করুন মেনু থেকে 'Not Interested' অপশন সিলেক্ট করে ফিড রিফ্রেশ করার। রিলস দেখে সঙ্গীকে বিচার না করে, ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। আগেকার মানুষদের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কগুলি দেখুন। আপনাকে এটা বুঝতে হবে যে, বাস্তব সম্পর্কে ভাল দিকগুলির পাশাপাশি ঝগড়া, খারাপ অভ্যাস, টাকা খরচ করতে না পারা, রাগের মাথায় কুকথা বলে ফেলা, সময় দিতে না পারার মতো বিষয়গুলি কমবেশি আসবেই। একসঙ্গে থাকতে দু'জনকেই কিছু কিছু কম্প্রোমাইজ, স্যাক্রিফাইস করতে হবে। তারপরও মানুষটি আপনার পাশে থাকে কিনা, কীভাবে আপনার সাহায্য করেন, সেটি বিচার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও মানুষই ১০০% পারফেক্ট হন না। তাই অন্যের সাজানো সম্পর্ক দেখে নিজেরটি বিচার করবেন না।