দীর্ঘদিন চললে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।রাতের পর রাত ঠিক ভোর ৩টের সময় ঘুম ভেঙে যাচ্ছে? অনেকেই এই অভিজ্ঞতাকে রহস্যময় বা আধ্যাত্মিক ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেন। অনেকে আবার সোশ্যাল মিডিয়াতেও এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পিছনে কোনও অলৌকিক কারণ নয়, বরং মানসিক চাপ, জীবনযাত্রার অভ্যাস বা শারীরিক সমস্যাই দায়ী।
ঘুম বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, রাতে এক বা একাধিক বার অল্প সময়ের জন্য ঘুম ভেঙে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটে, কিন্তু পরদিন সকালে তা মনে থাকে না। তবে যদি প্রায় প্রতি রাতেই একই সময়ে ঘুম ভেঙে যায় এবং আবার ঘুমোতে সমস্যা হয়, তা হলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। শরীরে কর্টিসল নামে একটি হরমোন রয়েছে, যাকে সাধারণত ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হয়। ভোরের দিকে এই হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে শুরু করে, যাতে শরীর ঘুম থেকে ওঠার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি দীর্ঘ দিন ধরে উদ্বেগ, মানসিক অস্থিরতা, আবেগজনিত চাপ বা অবসাদের মধ্যে থাকেন, তা হলে এই প্রক্রিয়া অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে গভীর রাতেই শরীর সতর্ক অবস্থায় চলে যায় এবং ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
তবে সব ক্ষেত্রেই যে কর্টিসল দায়ী, এমন নয়। চিকিৎসকদের মতে, উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতার পাশাপাশি একাধিক শারীরিক সমস্যাও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ হতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়া, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, হরমোনের ওঠানামা কিংবা অন্য কোনও স্বাস্থ্যগত জটিলতা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে।
এ ছাড়াও কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসও সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের শেষ ভাগে অতিরিক্ত চা বা কফি খাওয়া, ঘুমোতে যাওয়ার আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রাখা, সন্ধ্যার পরে মদ্যপান অথবা অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ঘুম ভাঙার পর মনের প্রতিক্রিয়া। অনেকেই জানান, মাঝরাতে ঘুম ভাঙতেই কাজ, পরিবার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা স্বাস্থ্য নিয়ে নানা চিন্তা মাথায় ভিড় করে। দিনের বেলায় যেসব সমস্যা সামলানো সহজ মনে হয়, গভীর রাতে সেগুলিই অনেক বেশি গুরুতর বলে মনে হতে পারে।
মনোবিদদের মতে, রাতের নীরবতায় বাইরের বিভ্রান্তি কম থাকায় মানুষ নিজের চিন্তার সঙ্গে একা হয়ে পড়েন। ফলে ছোটখাটো উদ্বেগও বড় আকার ধারণ করতে পারে। শরীর যদি আগেই মানসিক চাপের কারণে কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায় থাকে, তা হলে মস্তিষ্ক দ্রুত চিন্তার নতুন কারণ খুঁজতে শুরু করে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, শুধু ঘড়ির কাঁটার দিকে নজর না দিয়ে ঘুম ভাঙার পর শরীর ও মনের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা উচিত। ঘুম ভাঙার সময় উদ্বেগ, বুকজ্বালা, শ্বাসকষ্ট, শরীর গরম লাগা, ব্যথা বা অন্য কোনও উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। অনেক সময় এই লক্ষণগুলিই সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোর ৩টেয় ঘুম ভেঙে যাওয়া সাধারণত কোনও রহস্যময় সংকেত নয়। বরং এটি শরীরের এমন একটি ইঙ্গিত, যা জানায় যে কোনও না কোনও কারণে স্বাভাবিক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে। যদি এই সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, দিনের কাজকর্মে প্রভাব ফেলে বা অতিরিক্ত ক্লান্তি তৈরি করে, তা হলে ইন্টারনেটের নানা তত্ত্বে ভরসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।