সদগুরু২০১৫ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ২১ জুনকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও প্রস্তাবের পক্ষে একসঙ্গে ১৭৭টি দেশ সমর্থন জানিয়েছিল। এর আগে এত বিপুল সমর্থন কোনও প্রস্তাব পায়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের গুরুত্ব শুধুমাত্র কয়েকজন মানুষের একসঙ্গে যোগাসন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর তাৎপর্য অনেক গভীর। সদগুরুর মতে, মানবসভ্যতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে যোগ আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে এসেছি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মানুষের জীবনকে আরও স্বাস্থ্যকর ও সুখী করে তুলবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেন। বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে স্বাস্থ্যসেবার পিছনে বছরে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হয়। মানুষের সামনে অসংখ্য পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প থাকলেও রোগব্যাধির প্রকোপ কমছে না। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশও একই পথে এগোচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা। সদগুরুর কথায়, বর্তমান প্রজন্মের মতো আরাম-আয়েশ, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং ভোগ-বিলাস ইতিহাসে খুব কম প্রজন্মই পেয়েছে। তবুও আমরা নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে সুখী বা সবচেয়ে ভালোবাসাপূর্ণ প্রজন্ম বলে দাবি করতে পারি না। বরং উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক চাপ এবং অস্থিরতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
অনেক মানুষ ব্যর্থতার কষ্টে ভোগেন, আবার অনেকেই সাফল্যের চাপ সামলাতে পারেন না। কেউ নিজের সীমাবদ্ধতায় অসন্তুষ্ট, কেউ আবার নিজের স্বাধীনতাতেই অস্বস্তি বোধ করেন। এই অবস্থায় যোগ মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
যোগ আসলে কী?
সদগুরু বলেন, যোগ মূলত অন্তরের সুখের বিজ্ঞান। যোগ এমন একটি কৌশল, যা মানুষকে নিজের ভিতরে সুখ খুঁজে নিতে শেখায়। সুখ কোনও বাইরের বিষয় নয়। মানুষ নিজেই নিজের সুখ তৈরি করে। যদি না করে, তবে বাইরের কোনও অর্জনই তাকে স্থায়ী আনন্দ দিতে পারে না। যেমন বাহ্যিক জগতকে উন্নত করার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রয়েছে, তেমনই মানুষের অন্তর্জগতকে সুস্থ, স্থিতিশীল ও আনন্দময় করে তোলার জন্যও একটি বিজ্ঞান রয়েছে। সেই বিজ্ঞানই যোগ।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ এবং সম্পর্কের সঙ্কট বাড়ছে, তখন যোগ মানুষকে নিজেকে সামলানোর একটি কার্যকর পথ দেখাতে পারে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে, সামাজিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে, ফলে মানুষ মানসিকভাবে আরও একা হয়ে পড়ছে। আধুনিক জীবনযাত্রার এই সঙ্কটের মধ্যে যোগ একটি স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাতে পারে বলে মনে করেন সদগুরু।
যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি
যোগের অন্যতম বড় সুবিধা হল এর সরলতা। একবার পদ্ধতি শিখে গেলে কোনও বিশেষ জায়গা, যন্ত্রপাতি বা অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও পরিস্থিতিতে মানুষ যোগাভ্যাস করতে পারেন। সদগুরুর মতে, যোগ মানবকল্যাণের জন্য এক অসামান্য উপহার।
যোগ শব্দের প্রকৃত অর্থ
যোগ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল একাত্ব বা সংযুক্তি। সদগুরু ব্যাখ্যা করেন, মানুষের ভিতরে সবসময়ই বৃহত্তর কিছুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। এই আকাঙ্ক্ষা নানা রূপে প্রকাশ পায়। শারীরিক স্তরে তা প্রকাশ পায় যৌনতার মাধ্যমে। আবেগের স্তরে তা প্রকাশ পায় ভালবাসার মাধ্যমে। মানসিক স্তরে তা কখনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কখনও লোভ, কখনও ক্ষমতা বা সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে প্রকাশ পায়। কিন্তু যখন মানুষ সচেতনভাবে নিজের শক্তি ও চেতনার মাধ্যমে সেই একাত্বের সন্ধান করে, তখন তাকে বলা হয় যোগ। যোগ এমন একটি বিজ্ঞান, যা মানুষকে জাগতিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে অস্তিত্বের সঙ্গে গভীর সংযোগ অনুভব করতে সাহায্য করে।
আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের গুরুত্ব কোথায়?
সদগুরুর মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আজ বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরাও যোগ নিয়ে কথা বলছেন। বিভিন্ন দেশের সরকার যোগের প্রসারে উদ্যোগ নিচ্ছে এবং অর্থ ব্যয় করছে। এটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যচর্চার বিষয় নয়, বরং মানুষের সুখ এবং সুস্থতাকে একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, বহু শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুধু অর্থনীতি, সামরিক শক্তি বা উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছে না, মানুষের অভ্যন্তরীণ সুস্থতা নিয়েও আলোচনা করছে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের ফলে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
যোগাসনের মূল বার্তা
সদগুরুর মতে, যোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, প্রত্যেক মানুষ নিজের সুখ ও সুস্থতার দায়িত্ব নিজেই নিতে পারে। এর জন্য কোনও অলৌকিক শক্তি বা বাইরের সাহায্যের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। প্রকৃত সুখ খুঁজে পাওয়ার একমাত্র পথ হল নিজের ভিতরে যাত্রা করা। যোগের মূল দর্শন তাই ঊর্ধ্বমুখী বা বহির্মুখী হওয়া নয়, বরং অন্তর্মুখী হওয়া। কারণ নিজের ভিতরকে জানা এবং নিজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলেই মানুষ জীবনের প্রকৃত আনন্দ, শান্তি এবং পরিপূর্ণতার স্বাদ পেতে পারে।