ব্রয়লার চিকেন ফিটনেস সচেতন মানুষ হোন বা সাধারণ খাদ্যরসিক- প্রোটিনের অন্যতম সেরা উৎস হিসেবে চিকেন বা মুরগির মাংস প্রায় সবারই পছন্দের তালিকায় থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে, ১০০ গ্রাম চিকেন ব্রেস্টে প্রায় ২৫ থেকে ৩১ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন থাকতে পারে। চিকেনের অন্যান্য অংশে ফ্যাটের পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকায়, প্রোটিনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হয়। তবে, পুষ্টিগুণের কথা সরিয়ে রাখলে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা— সব জায়গাতেই ব্রয়লার মুরগি নিয়ে একটা জল্পনা প্রায়ই শোনা যায়।
অনেকেরই ধারণা, পোলট্রি ফার্মগুলিতে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে মুরগিগুলিকে দ্রুত বড় করার জন্য বিপজ্জনক সব ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক এবং গ্রোথ হরমোনের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়! দাবি করা হয়, ব্রয়লার মুরগি খাওয়ার ফলে মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক বিকাশে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক পোলট্রি বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘গুজব’ বা ভ্রান্ত ধারণা বলেই উড়িয়ে দিচ্ছেন। জেনে নেওয়া যাক, এর পেছনের আসল বৈজ্ঞানিক সত্যিটা কী।
মুরগিকে কি সত্যিই হরমোন দেওয়া হয়?
'দ্য হিউমেন লিগ'-র রিপোর্ট অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, ব্রয়লার মুরগির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম হরমোন প্রয়োগ করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি সংস্থাগুলো স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই ধারণাটি ভিত্তিহীন।
আসল সত্যিটা হল, ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য যে কোনও ধরনের গ্রোথ হরমোন দেওয়া আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ লক্ষ মুরগিকে প্রতিদিন ইঞ্জেকশন দেওয়া পোলট্রি ফার্মগুলোর পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব।
জনপ্রিয় গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডঃ.পালানিয়াপ্পন মানিকম তাঁর ইনস্টাগ্রামে এই বিষয়ে জানিয়েছেন, "ব্রয়লার চিকেন নিয়ে মানুষের মনে যে ভয় রয়েছে, তা আদ্যোপান্ত একটা মিথ। বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া মুরগির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য কোনও ধরনের কৃত্রিম হরমোন ব্যবহার করা হয় না। আর যদি হরমোনকে মুরগির খাবারের সঙ্গে মিশিয়েও খাওয়ানো হয়, তবে মুরগির পরিপাকতন্ত্র সেটিকে সাধারণ প্রোটিন হিসেবেই ভেঙে হজম করে ফেলবে। ফলে, মানুষের শরীরে এর কোনও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার প্রশ্নই ওঠে না।"
ওষুধ বা হরমোন ছাড়া ব্রয়লার মুরগি এত তাড়াতাড়ি বড় হয় কীভাবে?
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কৃত্রিম উপায় অবলম্বন না করা হলে মাত্র দেড় মাসে একটি মুরগি এত বড় হয় কীভাবে? 'অর্গানিক ফিডস'-র মতে, এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের জাদু। ব্রয়লার মুরগির প্রজাতি আমাদের পরিচিত দেশি মুরগির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই জাতটি প্রাকৃতিকভাবেই খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করে।
এর পেছনে মূল কারণগুলো হল
উন্নত জেনেটিক্স ও সিলেক্টিভ ব্রিডিং: গত কয়েক দশক ধরে পোলট্রি বিশেষজ্ঞরা শুধুমাত্র সেইসব মুরগির প্রজনন বা ব্রিডিং করিয়েছেন, যেগুলো শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে এবং খুব দ্রুত বাড়ে।
বিশেষ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার: ফার্মগুলোতে মুরগির খাবারের ওপর বিশেষ বৈজ্ঞানিক নজরদারি থাকে। তাদের প্রোটিন, ভিটামিন এবং খনিজ সমৃদ্ধ একেবারে মাপা সুষম ডায়েট দেওয়া হয়। এই হাই-প্রোটিন ডায়েটের ফলেই তাদের ওজন এত দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
হরমোনের পাশাপাশি আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হল অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। মুরগিকে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে বাঁচাতে কিছু ফার্মে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, এ কথা সত্যি। কিন্তু, গ্লোবাল গাইডলাইন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, মুরগি বাজারে বিক্রি বা মাংস কাটার বেশ কয়েকদিন আগেই এই ওষুধ দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হয়। এই সময়কালকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'উইথড্রয়াল পিরিয়ড' (Withdrawal Period)।
স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট 'হেলথলাইন'-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নিয়মটি অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হয়। এর ফলে মাংস যখন ক্রেতার প্লেটে পৌঁছায়, তখন মুরগির শরীরে ওষুধের কোনো অস্তিত্ব বা প্রভাব অবশিষ্ট থাকে না।
তাই বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন, সঠিক পদ্ধতিতে পালন করা ব্রয়লার মুরগি খেলে মানুষের শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা অন্য কোনও শারীরিক ক্ষতির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। অযথা আতঙ্কিত না হয়ে নিশ্চিন্তে আপনার প্রোটিন ডায়েটে চিকেন রাখতে পারেন।