ফাইল ছবি কলকাতা পুরসভায় এবার স্থায়ী অফিসে বসবেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্বামী প্রদীপ্তানন্দ ওরফে কার্তিক মহারাজ। রাস্তা, সেতু এবং জনবহুল জায়গার নামকরণ বা নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে রাজ্য সরকারের তৈরি ১০ সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান তিনি। সেই দায়িত্ব পালনের জন্যই কলকাতা পুরসভায় তাঁর জন্য নির্দিষ্ট ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সোমবার প্রথমবার সেই অফিসে বসে রাস্তার নাম পরিবর্তন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও দিয়েছেন কার্তিক মহারাজ। জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষও রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব এই অফিসে জমা দিতে পারবেন।
কার্তিক মহারাজ জানিয়েছেন, প্রথম পর্যায়ে কলকাতার রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবগুলি নিয়ে আলোচনা হবে। বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে প্রস্তাব এসেছে, সেগুলি খতিয়ে দেখবে কমিটি। নামের সঙ্গে ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক গুরুত্বের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও আলোচনায় আসবে।
১০০-র বেশি প্রস্তাব, বাবার নামেও রাস্তার আবেদন
কমিটির চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ১০০-র বেশি আবেদন বা প্রস্তাব জমা পড়েছে। সেই তালিকায় যেমন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নাম রয়েছে, তেমনই ব্যক্তিগত আবেদনও রয়েছে। কেউ কেউ নিজের বাবার নামেও রাস্তার নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কার্তিক মহারাজ।
অর্থাৎ, কোনও নির্দিষ্ট নাম সামনে এলেই সেটি রাস্তার নতুন নাম হয়ে যাচ্ছে না। প্রতিটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঐতিহাসিক গুরুত্ব, এলাকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। এরপর কমিটি তার মতামত বা সুপারিশ দেবে।
সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই কমিটির কাজই হল রাজ্যের রাস্তা, সেতু, অ্যাভিনিউ এবং বিভিন্ন জনবহুল স্থানের নামকরণ বা নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবকে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ঐতিহ্যের দিক থেকে পরীক্ষা করা। প্রয়োজনে ইতিহাসবিদ, হেরিটেজ বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের মতামতও নেওয়া যেতে পারে।
লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি কি বদলাবে?
রাস্তার নাম পরিবর্তনের আলোচনা সামনে আসতেই সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে কলকাতার লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি এবং হো চি মিন সরণির নাম। এই তিনটি রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব কমিটির আলোচনায় আসতে পারে বলে প্রকাশিত রিপোর্টে উঠে এসেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই মুহূর্তে কোনও রাস্তার নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কমিটির সদস্য তথাগত রায় ইতিমধ্যেই কিছু নামের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, লেনিন সরণির নাম গণিতজ্ঞ এবং প্রাক্তন ভারতীয় জনসংঘ সভাপতি দেবপ্রসাদ ঘোষের নামে করার প্রস্তাব এসেছে। কার্ল মার্কস সরণির ক্ষেত্রে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের প্রস্তাবের কথাও সামনে এসেছে। হো চি মিন সরণির ক্ষেত্রেও বিকল্প নাম নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এগুলি সবই প্রস্তাব- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
বিশ্ব বাংলা সরণির নামও বদলানোর প্রস্তাব?
‘বিশ্ব বাংলা সরণি’র নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কার্তিক মহারাজের বক্তব্যে চৈতন্য মহাপ্রভুর নামে নামকরণের সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রেও কোনও সরকারি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। রাস্তার নাম বদলের ক্ষেত্রে কোন নাম গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে কমিটির আলোচনাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কার্তিক মহারাজ জানিয়েছেন, ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত নামকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় থাকবে।
সপ্তাহে একদিন বসবে কমিটি
রাস্তার নাম পরিবর্তনের মতো বিষয়ে শুধু প্রস্তাব গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই নিয়মিত বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কার্তিক মহারাজ জানিয়েছেন, সপ্তাহে একদিন করে কমিটির সদস্যরা বৈঠকে বসবেন। সেখানে জমা পড়া প্রস্তাবগুলি নিয়ে আলোচনা হবে। প্রয়োজনে ইতিহাসবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদেরও আলোচনায় ডাকা হবে।
সরকারের তৈরি নির্দেশিকাতেও কমিটিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ইতিহাসবিদ, হেরিটেজ প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংস্থা এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিধানসভায় যাবে সুপারিশ
কমিটির আলোচনা এবং পর্যালোচনার পর প্রস্তাবগুলি পরবর্তী পর্যায়ে পাঠানো হবে। কার্তিক মহারাজ জানিয়েছেন, কমিটির সুপারিশ বিধানসভায় যাবে। তবে কলকাতা পুরসভার অধীন রাস্তার ক্ষেত্রে পুর আইন ও সংশ্লিষ্ট স্ট্রিট-নেমিং প্রক্রিয়াও প্রযোজ্য থাকবে। সরকারি নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, কমিটির সুপারিশ কোনও ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়াকে সরিয়ে দেবে না। অর্থাৎ, কমিটির বৈঠকে কোনও নাম নিয়ে সম্মতি তৈরি হলেই সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার নাম বদলে যাবে না। পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনগত ধাপও রয়েছে।
পুরসভায় কার্তিক মহারাজের জন্য অফিস
এই কাজের জন্য কলকাতা পুরসভায় কার্তিক মহারাজের জন্য একটি স্থায়ী অফিসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পুরসভা ভবনের প্রথম তলায় একটি ঘর তাঁকে বরাদ্দ করা হয়েছে। আগে ওই ঘরটি মেয়র পারিষদ দেবব্রত মজুমদার ব্যবহার করতেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্তিক মহারাজের বক্তব্য, আগের সরকারের আমলেও রাস্তার নামকরণ নিয়ে কমিটি ছিল। কিন্তু সেই কমিটির স্থায়ী দফতর বা বসার নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না। এবার সেই পরিকাঠামোর অভাব দূর করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, নিয়ম মেনে মতামত গ্রহণ এবং প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য কমিটির নিয়মিত বসা প্রয়োজন। ইতিহাসবিদদের সঙ্গে আলোচনা করার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট জায়গা থাকা দরকার।