Ethanol Petrol এর চক্করে দাম বাড়ছে চিনির? এবার সরকারের প্ল্যানটা কী

মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে এবার বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবেই চিনি উৎপাদন কম যাওয়ার আশঙ্কা। কেন্দ্রের উদ্বেগ, আগামী দিনে যদি আখের ফলন কম হলে ইথানল ও চিনির উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

Advertisement
Ethanol Petrol এর চক্করে দাম বাড়ছে চিনির? এবার সরকারের প্ল্যানটা কীচিনির দাম নিয়ন্ত্রণে প্ল্যান সরকারের।
হাইলাইটস
  • চিনির উৎপাদন কমলে বাড়বে দাম।
  • ইথানল না চিনি, কোনটা বাছবে সরকার।

অগাস্ট কাটলেই শুরু হয়ে যাবে উৎসবের মরসুম। আর বাঙালির উৎসব মানে মিষ্টি মাস্ট। সেই মিষ্টির দামই হতে পারে আকাশছোঁয়া। কারণ এখন কেন্দ্রের অবস্থা শ্যাম রাখি না কূল! আখ চাষ ও চিনি উৎপাদনের এ এক জটিল সমীকরণ। যার আঁচ আপনার কাপের চা থেকে শুরু করে গাড়ির জ্বালানি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। বাজারে এখন ঊর্ধ্বমুখী চিনির দাম। আর তাই আগামী মরসুমে আখ থেকে চিনি নাকি ইথানল, কোনটা কতখানি তৈরি হবে, সে নিয়ে অঙ্ক কষছে কেন্দ্রীয় সরকার। এমনটাই দাবি সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজ্যগুলিতে আগামী অক্টোবর থেকে শুরু হতে চলা নতুন চিনির মরসুমে আখ থেকে ইথানল তৈরির পরিমাণের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ টানতে চাইছে সরকার। উদ্দেশ্য, আখের সিংহভাগ অংশ যেন চিনি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এতে বাজারে চিনির জোগান বৃদ্ধি পাবে। রেকর্ড ছোঁয়া দাম কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

ইথানল হলে চিনির ঘাটতি

দেশের অন্যতম দুই প্রধান আখ উৎপাদক রাজ্য মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটক। এবার বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হয়েছে ওই দুই রাজ্যে। আর পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবেই আগামী বছরে চিনি উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।  উদ্বেগের বিষয় একটাই, আগামী দিনে যদি আখের ফলন কম হয় এবং সেই কম আখের একটি বড় অংশ যদি ইথানল উৎপাদনে চলে যায়, তাহলে খোলা বাজারে চিনির জোগানে ব্যাপক টান পড়বে।

চিনি উৎপাদনের ১০% ইথানল

পরিস্থিতির গুরুত্ব কতটা তা বুঝতে ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পেশ করা পরিসংখ্যান যথেষ্ট। তাদের মতে, চলতি বছরেই দেশের সুগার মিলগুলি প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনির সমপরিমাণ আখের রস ব্যবহার করেছে ইথানল তৈরিতে। এটি দেশের মোট চিনি উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের সমান। একই সঙ্গে গত এক মাসে ভারতে চিনির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। রয়টার্সের আগের একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, আগামী অন্তত তিন মাস চিনির বাজার ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে।

Advertisement

চিনির বিকল্প চাল ও ভুট্টা

কিন্তু এখানে কেন্দ্র উভয় সংকটে। পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা ধরে রাখতে হবে। ফলে আখের রসের ঘাটতি পূরণ করতে এবার নজর দেওয়া হচ্ছে ভুট্টা ও চাল থেকে তৈরি ইথানলের ওপর। বর্তমানে দেশে চাল ও ভুট্টার মজুত পর্যাপ্ত। তাই ইথানলের জোগান ঠিক রাখতে এই দুই শস্যের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। তবে চাল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়। আবার দেশে পর্যাপ্ত ভুট্টা চাষ হয় কিনা, সেটাও আলোচনার বিষয়।

চিনির রসে ইথানল

সূত্রের খবর, চিনি মিলগুলিকে সরাসরি বি-হেভি মোলাসেস থেকে ইথানল তৈরি বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারে সরকার। তার বদলে মিলগুলিকে কেবল সি-হেভি মোলাসেস' ব্যবহার করে ইথানল উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। আখ থেকে অধিকাংশ চিনি বের করে নেওয়ার পর অবশিষ্ট যে গাঢ় তরল পড়ে থাকে, সেটাই হল সি-হেভি মোলাসেস।

ইতিমধ্যেই চিনি রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। পাশাপাশি গত মাসেই চিনি ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট স্টকের ওপর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার আখ থেকে ইথানল তৈরির পরিমাণের ওপর রাশ টানার বিষয়টিও বিবেচনাধীন।

আগেভাগে আখ কাটাই

কেন্দ্রীয় খাদ্য সচিব সঞ্জীব চোপড়াকে একটি চিঠি দিয়েছে ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাদের আর্জি, অক্টোবরে আখ কাটার কাজ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০-১৫ দিন আগে শুরু করার অনুমতি দেওয়া হোক, যাতে উৎসবের মরসুম শুরুর আগেই নতুন চিনি বাজারে পৌঁছতে পারে। তবে কাজের সময় এগিয়ে আনার ফলে যে আর্থিক ক্ষতির মুখ দেখতে হতে পারে, তার জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার দাবিও জানিয়েছে মিলগুলি। মিল মালিকদের বক্তব্য, সরকারি সাহায্য পেলে বাজারে চিনির জোগান স্বাভাবিক হবে। কমবে দাম।

চিনির ঘাটতির দাবি ওড়াল কেন্দ্র

তবে এই অঙ্কে একটি নাটকীয় মোড় রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে দেশে চিনির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেই দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে। গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ চিনির মজুত রয়েছে। সরকারের উদ্বেগ, ভবিষ্যতে চিনির ঘাটতি হতে পারে,এমন  আশঙ্কায় দর বৃদ্ধির চেষ্টা করছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। আর এই ফাটকাবাজি বন্ধ করতেই ১ অগাস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ডিলারদের জন্য নির্দিষ্ট মজুতের সীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, একদিকে সরকার বলছে চিনি পর্যাপ্ত, অন্যদিকে দাম বাড়ছে, আবার অন্যদিকে মিলগুলি আখ কাটার কাজ দ্রুত শুরু করার আর্জি জানাচ্ছে। এই তিনটি ঘটনা তো পরস্পরবিরোধী! 

ইথানলের জন্য চিনির সংকট?

মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের মতো বড় উৎপাদক রাজ্যে কম বৃষ্টির কারণে এল নিনোর প্রভাবে যদি আখের ফলন কমে যায়, তাহলে বাজারে চাপ আরও বাড়বে। আর ঠিক এই জায়গাতেই প্রবেশ ঘটছে ইথানলের। মনে করিয়ে দিই, সরকার পেট্রোলে ইথানল ব্লেন্ডিং বাড়ানোর যে লক্ষ্য নিয়েছে, তার প্রধান কাঁচামাল এই আখ। আখ থেকে চিনি তৈরি যেমন সম্ভব, তেমনই একই রস থেকে তৈরি হয় ইথানল। তবে ইথানল বানানোর জন্যই দেশে চিনির সংকট তৈরি হয়েছে, এমনটা ভাবা এই মুহূর্তে ভুল হবে। সরকারও পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা কড়া পদক্ষেপ করছে। জুলাই মাসেই মিলগুলির মজুত চিনির খোঁজখবর শুরু করেছিল কেন্দ্র।

চিনির দাম কেন বাড়ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে,বাজার কেবল বর্তমান মজুতের ওপর ভিত্তি করে চলে না। দু'মাস পর বাজারে জোগান কম পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হলেই আজ থেকে দর চড়তে শুরু করে। চিনির ক্ষেত্রেও ঠিক এই আশঙ্কাই কাজ করছে। ভারতে চিনির মরসুম হিসাব করা হয় অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ১ অক্টোবর নতুন চিনি মরসুম শুরু হলে মিলগুলি নতুন আখ মাড়াইয়ের কাজ শুরু করে। নতুন চিনি আসতে শুরু করে বাজারে। তবে চিন্তার বিষয় হল, ১ অক্টোবরের মধ্যে পুরনো মরসুমের কতটা চিনি উদ্বৃত্ত থাকবে এবং নতুন চিনি কত দ্রুত বাজারে নামবে।

Advertisement

এই টানাপোড়েনে কৃষক, মিল মালিক এবং সাধারণ ক্রেতা, কারওর স্বার্থই এক সূত্রে গাঁথা নয়। কৃষক চান সময়মতো আখের বকেয়া দাম, মিল মালিকের লক্ষ্য উৎপাদন খরচ তোলা, আর সাধারণ মানুষ চান চিনির দাম অন্তত মধ্যবিত্তের নাগালে থাকুক।

চিনি না ইথানল?

সামনেই উৎসবের মরসুম। এই সময়ে ভারতে মিষ্টি ও চিনির চাহিদা চরম সীমায় পৌঁছয়। তাই চিনি কেবল রান্নাঘরের সাধারণ উপাদান নয়। সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই, আগামী কয়েক মাসে দেশের আঁখ প্রধানত কোন কাজে লাগবে? চিনি নাকি ইথানল? সেটা সময়ই বলবে।

TAGS:
POST A COMMENT
Advertisement