রুপোর দামে বড় ধাক্কা। আপনার আংটি আর বিশ্বের সবচেয়ে দামি এআই ডেটা সেন্টারের মধ্যে একটা মিল রয়েছে। কী জানেন? রুপো। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি এক কেজি রুপোর দাম ছিল ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৬৩২ টাকা। আর ২৩ অক্টোবর সেই দাম নেমে এসেছে প্রায় ১ লক্ষ ৯৬ হাজার ১৭০ টাকায়। এক কেজি রুপোর দাম কমেছে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকারও বেশি। প্রায় ৫০ শতাংশ দাম পড়েছে মাত্র ৯ মাসে। ধনতেরসে সোনা-রুপো কেনার ধুম পড়ে। রুপোর দাম প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়ার পরে কি এখন কেনা উচিত? নাকি আরও অপেক্ষা করবেন? আজ রুপোর পুরো কাহিনি জানাব আপনাদের।
রুপোর কাহিনি শুধু গয়নায় আটকে নেই। সারা বিশ্বের এআই ডেটা সেন্টার, সোলার প্যানেল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় এই ধাতু। তা হলে এআই এবং ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা বাড়লেও রুপোর দাম কমছে কেন? আমেরিকার এআই সংস্থাগুলির শেয়ারের দর পড়লে ভারতের বাজারেও রুপোর দাম কেন প্রভাবিত হচ্ছে? আগামী দিনে রুপোর দাম কোন দিকে যেতে পারে? প্রথমেই দেখা যাক, সাম্প্রতিক সময়ে রুপোর দামে কতটা পতন হয়েছে।
রুপোর দাম কতটা কমেছে
১৪ অক্টোবর এক কেজি রুপোর খুচরো দাম ছিল ২ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা। পরের দিনই দাম কমে যায় ৫ হাজার টাকা। তারপর ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দাম ছিল একই। ২২ অক্টোবর আরও ৫ হাজার টাকা কমে দাম দাঁড়ায় ২ লক্ষ ২৫ হাজার টাকায়। ২৩ অক্টোবর আরও ৫ হাজার টাকা কমে এক কেজি রুপোর দাম হয় প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। মাত্র ১০ দিনে খুচরো বাজারে এক কেজি রুপোর দাম কমেছে ১৫ হাজার টাকা। তবে আরও একটি তথ্য চমকে দিতে পারে। জানুয়ারির তুলনায় রুপোর দাম প্রায় অর্ধেক হলেও পাঁচ বছর আগের তুলনায় এখনও তিন গুণেরও বেশি দামি এই ধাতু। ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের ২০ অক্টোবর এক কেজি রুপোর দাম ছিল ৬৪ হাজার ৪৯৬ টাকা। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর সেই দাম ১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৭৭০ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে রুপোর দাম বেড়েছে প্রায় ২১০ শতাংশ।
রুপোর দাম কেন কমছে
তেলের দাম বৃদ্ধি থেকে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা, সেখান থেকে সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ এবং ডলারের শক্তিশালী হয়ে ওঠা, এই গোটা প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়েছে রুপোর বাজারে। সেই সঙ্গে মুনাফা তুলে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। সহজ কথায়, কোনও সম্পদ কম দামে কেনার পর তার দাম অনেকটা বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা সেই সম্পদ বিক্রি করে মুনাফা ঘরে তোলেন। রুপোর ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবার ভারতের বাজারের দিকে নজর দেওয়া যাক। ভারত নিজের প্রয়োজনীয় রুপোর ৮০ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। চলতি বছরের মে মাসে রুপো আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। বিদেশ থেকে রুপো আনতে বিশেষ অনুমতি দরকার। জুন মাসে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়। পাশাপাশি আমদানি শুল্কও ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল। এর ফলে ভারতে রুপো আমদানি করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। কিছু সময়ের জন্য বাজারে সরবরাহেও টান পড়েছিল। ২২ অক্টোবর সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগামী ৬ মাসে প্রায় ৬,৫০০ টন রুপো আমদানির জন্য অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে। বাজারে এই খবর পৌঁছতেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, আগামী কয়েক মাসে রুপোর জোগান বাড়তে পারে। ফলে আগের মতো সরবরাহে টান নাও থাকতে পারে।
এআই কানেকশন
রুপোর দাম কমার অন্যতম কারণ আমেরিকার বাজার। সাম্প্রতিক সময়ে সে দেশের প্রযুক্তি এবং এআই সংস্থাগুলির শেয়ারের উপর চাপ বেড়েছে। এআই-এর জন্য বিপুল অর্থ খরচ করছে বিভিন্ন সংস্থা। তৈরি হচ্ছে ডেটা সেন্টার, কেনা হচ্ছে কম্পিউটার চিপ, শুরু হচ্ছে নতুন নতুন প্রকল্প। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের মনে এখন প্রশ্ন উঠছে, এত টাকা খরচ করে সংস্থাগুলি কতটা আয় করতে পারছে? মার্কিন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা লোকসান সামাল দিতে এখন রুপো বিক্রি করছেন।
ধনতেরসে রুপো কিনবেন?
এখন প্রশ্ন হল, ধনতেরসে আপনি রুপো কিনবেন, না দাম আরও কমার অপেক্ষায় থাকবেন? জানুয়ারির তুলনায় রুপোর দাম প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ৫ বছর আগের তুলনায় এখনও এই ধাতুর দাম তিন গুণেরও বেশি। নতুন প্রযুক্তির জন্য রুপোর প্রয়োজন ক্রমশ বাড়ছে। তবে আপাতত বাজারদর নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিচ্ছেন বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা।
এটাও মাথায় রাখা দরকার, রুপোর প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে না। এআই, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে আগামী দিনেও এই ধাতুর ব্যবহার থাকবে। কিন্তু আপাতত বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত, সুদের হারের সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং শিল্পক্ষেত্রে চাহিদার ওঠানামা রুপোর দামের উপর প্রভাব ফেলছে।