কলকাতার আবাসন বাজারদেশের বড় শহরগুলিতে যখন প্রিমিয়াম ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়ছে, তখনও কলকাতার আবাসন বাজারে মন্দা। ভরসা কম টাকার ফ্ল্যাট। সেই কারণেই ২০২৬ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে দেশের সাতটি প্রধান আবাসন বাজারের মধ্যে কলকাতায় সবচেয়ে কম সংখ্যক নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে। এমনটাই দাবি আনারক (ANAROCK) নামে একটি সংস্থার রিপোর্টে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শহরে মাত্র ৪,৬৫০টি নতুন আবাসন ইউনিট তৈরি হয়েছে। সেখানে মুম্বই মহানগর অঞ্চলে নতুন বাড়ির সংখ্যা ৩৭,৫০০ এবং হায়দরাবাদে ১৮,৯৫০। কেন কলকাতার বাজারের এই হাল? কত টাকার স্কোয়ারফুটে এখানে বিকোচ্ছে ফ্ল্যাট?
রিপোর্ট বলছে, দেশের সাতটি প্রধান আবাসন বাজারের মধ্যে কলকাতায় প্রিমিয়াম বাড়ির সংখ্যা সবচেয়ে কম। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শহরে যত নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে, তার মাত্র ৪ শতাংশের দাম ছিল দেড় কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে, হায়দরাবাদে এই শ্রেণির বাড়ি ৬৬ শতাংশ, দিল্লিতে ৬২ শতাংশ এবং বেঙ্গালুরুতে ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ এই শহরগুলিতে দামি ও বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের উপর নির্মাণ সংস্থাগুলির জোর অনেক বেশি। এর উল্টো দিকে কলকাতায় সাশ্রয়ী ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে থাকা বাড়ির অনুপাত সর্বাধিক। শহরে নতুন আবাসন প্রকল্পের ৫৭ শতাংশই এই শ্রেণির। অর্থাৎ প্রথম বার বাড়ি কিনতে চাওয়া মানুষ এবং সীমিত বাজেটের পরিবারগুলির চাহিদাই কলকাতার আবাসন বাজারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কলকাতায় ফ্ল্যাটের ক্রেতা কারা.
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখানে বাড়ির চাহিদার বড় অংশই প্রকৃত ক্রেতাদের কাছ থেকে আসছে, যাঁরা নিজেরা বসবাস করার জন্য বাড়ি কিনতে চান। লগ্নির জন্য ফ্ল্যাট কেনেন না। কলকাতায় নির্মাণসংস্থাগুলি এখনও বাড়ির দাম এবং ক্রেতাদের আর্থিক সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখেই নতুন ফ্ল্যাট আনছে।
কলকাতায় কত বিক্রি
কলকাতায় নতুন বাড়ির তৈরির সংখ্যা কম হলেও বিক্রি এবং জোগানের মধ্যে ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে শহরে প্রায় ৪০০০টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে। সেই সময়ে তৈরি হয়েছিল ৪৬৫০টি নতুন বাড়ি। বিক্রি ও নতুন জোগানের মধ্যে এই তুলনামূলক কম ব্যবধান ইঙ্গিত করছে, নির্মাণ সংস্থাগুলি বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন বাড়ি তৈরি করছে। ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়বে, এই আশায় একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাড়ি তৈরি না করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প হাতে নিচ্ছে তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রকল্প শুরুর আগে ক্রেতাদের প্রকৃত চাহিদা এবং আর্থিক সামর্থ্য খতিয়ে দেখতে হয় নির্মাণ সংস্থাগুলিকে। তাই দেশের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় কলকাতায় নতুন বাড়ি তৈরির গতি কিছুটা ধীর হতে পারে।
কলকাতায় পার স্কোয়ারফুটের দাম কত?
এর ফলে অবিক্রিত বাড়ির পড়ে থাকার ঝুঁকিও কম। কলকাতায় নতুন বাড়ির সংখ্যা কম থাকার অন্যতম কারণ সম্পত্তির তুলনামূলক কম দাম। শহরে আবাসিক সম্পত্তির গড় দাম প্রতি বর্গফুট প্রায় ৬,৫০০ টাকা। রিপোর্টে থাকা সাতটি প্রধান আবাসন বাজারের মধ্যে এই দামই সর্বনিম্ন। মুম্বই মহানগর অঞ্চলে বাড়ির গড় দাম প্রতি বর্গফুট প্রায় ১৮,০০০ টাকা এবং দিল্লিতে প্রায় ১০,০০০ টাকা।
যে সব শহরে বাড়ির দাম বেশি, সেখানে প্রিমিয়াম ও বিলাসবহুল প্রকল্প থেকে নির্মাণ সংস্থাগুলির বেশি মুনাফা করার সম্ভাবনা। ফলে বড় আকারে এই ধরনের প্রকল্প তৈরির উৎসাহও বাড়ে। কিন্তু কলকাতায় বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে দাম এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এখানকার নির্মাণ সংস্থাগুলিকে প্রকল্পের পরিকল্পনা করতে হয় অনেক বেশি সতর্ক হয়ে।
দেশের অন্যান্য বড় শহরেও দামি বাড়ির দিকে ঝোঁক বেড়েছে। হায়দরাবাদ, এনসিআর এবং বেঙ্গালুরুতে দেড় কোটি টাকার বেশি দামের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সংখ্যা বেশি। কলকাতায় সাশ্রয়ী ও নিম্ন-মধ্যমূল্যের বাড়ির চাহিদা বেশি থাকায় বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ এখনও সীমিত। পরিসংখ্যান থেকে এও স্পষ্ট যে, কলকাতার আবাসন বাজার নিজের গতিতে এগোচ্ছে।