আগামী কয়েক মাসের মধ্যে Food Crisis? জয়শঙ্করের কথার মানে বুঝুন সহজ ভাষায়

সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাঁর কথায়,'আগামী কয়েক মাসে সম্ভবত একটা বড় খাদ্যসংকট দেখা দিতে চলেছে'। সমস্যা শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। কয়েকটি বড় শস্য রফতানিকারক দেশ কৃষ্ণসাগর হয়ে তাদের শস্য বাইরে পাঠাতে পারছে না বলে জানান বিদেশমন্ত্রী।

Advertisement
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে Food Crisis? জয়শঙ্করের কথার মানে বুঝুন সহজ ভাষায়   খাদ্য সংকটের সতর্কবার্তা জয়শঙ্করের
হাইলাইটস
  • খাদ্য সংকটের আশঙ্কা জয়শঙ্করের।
  • জ্বালানি, সার থেকে ভোজ্যতেলে প্রভাব।

খাদ্যসঙ্কট! সোশ্যাল মিডিয়ায় কী-ওয়ার্ড বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের এই কথা। সত্যিই কি আগামী দিনে বড় খাদ্য সংকটে দেখা দেবে? ঠিক কী বলতে চেয়েছেন জয়শঙ্কর? যুদ্ধের কারণে মার্চ-এপ্রিল মাসে সঙ্কট ছিল চরমে। তখন প্রশ্ন ছিল, তেল আসবে কোত্থেকে? পেট্রোল-ডিজেলের দাম কতটা বাড়বে? এখন বিশ্বের সামনে এখন মূলত জোড়া সংকট। একটা খাবার, অন্যটা জ্বালানি। দৈনন্দিন জীবন চালাতে দু'টিরই দরকার। এবার প্রশ্নটা হল, ভারতে জিনিসপত্রের দাম কতটা বাড়তে পারে?

জয়শঙ্করের পুরো বক্তব্যের মোদ্দা কথা হল, যুদ্ধের কারণে প্রথমে জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা। তার জেরে তেল ও গ্যাসের দামবৃদ্ধি। গ্যাস সার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। সারের উৎপাদন কমে গেলে বা দাম বাড়লে ফসলের ফলনের উপর প্রভাব পড়ে। আবার যুদ্ধ চলতে থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলি থেকে অর্থও বেরিয়ে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ বাজারে অর্থ বিনিয়োগ করেন। সহজ ভাষায়, একই সময়ে জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার এবং অর্থ, চার দিক থেকেই চাপ তৈরি হচ্ছে। চলুন বিষয়টা একটু ভাল করে বোঝা যাক। 

জ্বালানি সংকট

ভারত নিজের প্রয়োজনের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে সেই বাড়তি খরচের প্রভাব কোনও না কোনওভাবে পড়বেই। শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়। শাকসবজি পাঠানো ট্রাকে ডিজেল লাগে। বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া অনলাইন অর্ডারের ক্ষেত্রেও লাগে জ্বালানি। বাস চলে, ট্রাক চলে, কারখানায় পণ্য পৌঁছয়, বিমান সংস্থাগুলিও জ্বালানি কেনে। স্বাভাবিকভাবেই জিনিসপত্রের দামও বাড়বে।

খাদ্যশস্যের সংকট

খাদ্যশস্যের সংকট বুঝতে হলে, দু’টি প্রশ্ন আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমত, যে শস্য ইতিমধ্যেই উৎপাদিত হয়েছে, তা বিশ্বের বাজারে পৌঁছবে কীভাবে? দ্বিতীয়ত, যে শস্য এখনও উৎপাদন হওয়ার কথা, তার জন্য প্রয়োজনীয় সার আসবে কোথা থেকে? একদিকে ইউক্রেন, অন্যদিকে রাশিয়া এবং নীচে তুরস্ক। রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের বড় শস্য রফতানিকারক দেশ। বিশেষ করে গম-সহ বিভিন্ন খাদ্যশস্যের বড় অংশ এই অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। শস্য উৎপাদনে সমস্যা নেই। শস্য রয়েছে, কিন্তু বন্দর থেকে জাহাজ না ছাড়লে ক্রেতার কাছে পৌঁছবে না।

Advertisement

সারের সংকট

বিশ্বের সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ টন যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এর মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ ইউরিয়া, প্রায় ৫০ শতাংশ সালফার এবং ২০-৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া। সংঘাতের পরে ডিএপি-র দাম ২৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ টন সার পরিবহণে দেরি হয়েছে। ইউরিয়ার সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরাসরি যোগ রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস শুধু রান্না বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় না, নাইট্রোজেন সার তৈরিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হলে সার কারখানাগুলির কাঁচামাল পেতেও সমস্যা। অন্যদিকে, সার জাহাজে করে বাইরে পাঠাতেও জ্বালানির প্রয়োজন। অর্থাৎ এক দিকে সার উৎপাদন, অন্যদিকে সারের জোগানও ধাক্কা। 

মার্চ থেকে সমস্যা হলে সেপ্টেম্বরে কেন সতর্কবার্তা?

প্রশ্ন উঠতে পারে, সার সরবরাহে যদি মার্চ থেকেই সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে জয়শঙ্কর সেপ্টেম্বরে এসে আগামী মাসগুলিতে খাদ্যসঙ্কটের আশঙ্কার কথা বলছেন কেন? কারণ কৃষিকাজ অনলাইন অর্ডারের মতো নয়। আজ সার পাওয়া গেল না, পরের সপ্তাহে অর্ডার করে নিলেই সমস্যা মিটে গেল, এমন নয়। ফসলের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সামনে সমস্যা

প্রথম সমস্যা, সার। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়লেও কৃষকদের উপর তার পুরো বোঝা যাতে না পড়ে, সে জন্য সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয়। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ইউরিয়া ভর্তুকিতে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং নিউট্রিয়েন্ট-বেসড ফার্টিলাইজারের ভর্তুকিতে প্রায় ৪৫৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়লে তার পুরো প্রভাব কৃষকের বিলের উপর সঙ্গে সঙ্গে দেখা না গেলেও সেই খরচ অদৃশ্য হয়ে যায় না। তার একটা অংশ এসে পড়ে সরকারের বাজেটের উপর। শেষ পর্যন্ত সেই খরচের প্রভাব কোনও না কোনও ভাবে অর্থনীতির উপরই পড়ে।

দ্বিতীয় সমস্যা, সারের জোগান। কৃষকের হাতে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া বড় দায়িত্ব। জোগানে দেরি হলে শুধু সারের দামই সমস্যা নয়, ফসলের ফলনও কমে। 

তৃতীয় সমস্যা, ভোজ্যতেল। ভারত তার মোট ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ২৩ সেপ্টেম্বর পাম তেল, সয়াবিন তেল এবং সূর্যমুখী তেলের আমদানি শুল্কও কমিয়েছে সরকার। গত এক বছরে ভারতে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।

এখনই সবকিছুর দাম বাড়বে?

অবশ্যই এমন নয় যে আগামিকাল সকালেই সব জিনিসের দাম বেড়ে যাবে। ভারতে খাদ্যশস্য শেষ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। কিন্তু এস জয়শঙ্করের সতর্কবার্তার মূল কথা হল, এই সমস্যাগুলিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

POST A COMMENT
Advertisement