এবার ৫-ইউনিট ফ্যামিলি ফর্মুলায় বাড়বে মাইনে?8th Pay Commission New Updates: একজন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীর বেতন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত খরচের মাপকাঠি নয়। বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খাবার—এগুলোও খরচের অন্তর্ভুক্ত এবং অনেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে তাঁদের বয়স্ক বাবা-মায়ের দায়িত্বও এই আয়ের ওপর নির্ভর করে। এখন প্রশ্ন হলো, ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করার সময়, এই পুরো পরিবারের দায়িত্বের কথা কি বিবেচনা করা হয়?
কর্মচারী সংগঠনগুলো অষ্টম বেতন কমিশনের সামনে ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছে। তাদের দাবি, বেতন নির্ধারণের পুরনো পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে এবং কর্মচারীর পারিবারিক গণনার ক্ষেত্রে নির্ভরশীল পিতামাতাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অষ্টম বেতন কমিশন এই দাবি মেনে নিলে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের ভিত্তি পুরোপুরি বদলে যাবে।
৩ ইউনিট ফর্মুলার কোনও বাবা-মা নেই
বর্তমান পারিবারিক ভোগ মডেলে (Family Consumption Model) একটি পরিবারকে তিনটি একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে কর্মচারীকে ১ একক, তার জীবনসঙ্গীকে ০.৮ একক এবং দুই সন্তানকে ১.২ একক গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা মোট তিনটি একক তৈরি করে। কর্মচারী সংগঠনগুলো যুক্তি দেয় যে এই মডেলে নির্ভরশীল পিতামাতার ব্যয় আলাদাভাবে হিসাব করা হয় না। তবে, বাস্তব জীবনে এমন অনেক কর্মচারী আছেন যাঁদের বাবা-মায়ের ওষুধপত্র, চিকিৎসা, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের ভারও বহন করতে হয়। অল ইন্ডিয়া ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (AIDEF) অষ্টম বেতন কমিশনের কাছে এই মডেলটি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে। ফেডারেশনের যুক্তি হলো, আজকের পারিবারিক ও আর্থিক প্রেক্ষাপটকে পুরোনো মানদণ্ডে বিচার করা যায় না।
অভিভাবকদের বিষয়ে ৫ ইউনিটের প্রস্তাব
অল ইন্ডিয়া ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অষ্টম বেতন কমিশনের কাছে ৩-ইউনিট পরিবার সূত্রটি প্রতিস্থাপন করে একটি নতুন ৫-ইউনিট পরিবার মডেলের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবে কর্মচারীর জন্য ১ ইউনিট, জীবনসঙ্গীর জন্য ১ ইউনিট, দুই সন্তানের জন্য ১.৬ ইউনিট এবং নির্ভরশীল বাবা ও মা প্রত্যেকের জন্য ০.৮ ইউনিট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো যোগ করলে মোট ৫.২ ইউনিট হয়, যা ৫ ইউনিট হিসাবে গণ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদি এই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়, তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে যে, যদি কর্মচারীর বাবা-মা তার উপর নির্ভরশীল হন, তবে তাদের খরচও ন্যূনতম বেতন গণনার অন্তর্ভুক্ত হবে।
এর পেছনে আইনটিকেও উল্লেখ করা হয়েছে
কর্মচারী সংগঠনগুলো তাদের দাবির সমর্থনে ‘পিতামাতা ও প্রবীণ নাগরিকদের ভরণপোষণ ও কল্যাণ আইন, ২০০৭’-এরও উল্লেখ করছে। এই আইনের ৪ নং ধারা অনুযায়ী, যে সকল পিতামাতা তাদের আয় বা সম্পদ থেকে নিজেদের ভরণপোষণ করতে অক্ষম, তারা তাদের সন্তানদের কাছ থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। এআইডিইএফ (AIDEF) যুক্তি দেয় যে, যদিও অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা তাদের পিতামাতার যত্ন নেওয়ার জন্য আইনত বাধ্য, তবুও ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের সময় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ঔষধপত্র, চিকিৎসা, পরীক্ষা এবং যাতায়াতের মতো খরচগুলোকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
এখান থেকে ৬৯,০০০ টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবি করা হয়েছে
এইখানেই ৬৯,০০০ টাকা ন্যূনতম বেতন এবং ৩.৮৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবিটি সামনে আসে। কর্মচারী সংগঠনগুলো অষ্টম বেতন কমিশনের কাছে ন্যূনতম বেসিক বেতন বাড়িয়ে ৬৯,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে। এর সঙ্গে ৩.৮৩৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বর্তমান ১৮,০০০ টাকার ন্যূনতম বেসিক বেতন থেকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে। তবে, একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি, ৬৯,০০০ টাকা বা ৩.৮৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কোনও অনুমোদিত বেতন নয়। এগুলো কর্মচারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে করা দাবি এবং প্রস্তাব। ন্যূনতম মজুরির যেকোনও বৃদ্ধি অষ্টম বেতন কমিশনের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সরকারি অনুমোদনের উপর নির্ভর করবে।
৫ ইউনিট মডেলটি বিবেচনা করলে কী সুবিধা রয়েছে?
এই দাবির প্রভাব শুধু পরিবারের সংজ্ঞা পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কর্মচারী সংগঠনগুলো যুক্তি দেখায় যে, পরিবারে দুজন নির্ভরশীল পিতামাতাকে অন্তর্ভুক্ত করলে তা মৌলিক প্রয়োজনীয়তার খরচকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিফলিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মচারীর উপার্জন থেকে তার পিতামাতার ঔষধপত্র এবং চিকিৎসার খরচও মেটানো হয়। বর্তমান ৩-ইউনিট মডেলে এই অতিরিক্ত দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় না। ৫-ইউনিট মডেল বাস্তবায়নের ফলে, এই ধরনের খরচগুলো বেতন নির্ধারণের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
যদি অষ্টম বেতন কমিশন এই মডেলটি গ্রহণ করে এবং এর উপর ভিত্তি করে ন্যূনতম বেতন পরিবর্তনের সুপারিশ করে, তবে এর সুবিধা সেইসব কর্মচারীদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে যারা তাদের পিতামাতার আর্থিক দায়িত্ব বহন করেন। কর্মচারী সংগঠনগুলো চায় যে ২০২৬ সালের চাহিদা প্রতিফলিত করার জন্য ন্যূনতম বেতনের পূর্ণাঙ্গ ব্যয় মডেলটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। এর মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি, আবাসন, ভাড়া, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পোশাক, সন্তানদের শিক্ষা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ এবং ডিজিটাল পরিষেবার মতো খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই যুক্তিও দেওয়া হয় যে, বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে কাজের ধরন ভিন্ন হয়। ফিল্ড পর্যায়ে কর্মরত বা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন এমন কর্মচারীদের খাদ্য ও ক্যালরির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। সুতরাং, সকল কর্মচারীর জন্য একক ভিত্তিতে ব্যয় নির্ধারণ করা যথেষ্ট নাও হতে পারে।
৩.৮৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বলতে কী বোঝায়?
ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর হলো সেই গুণক যা পুরনো বেসিক বেতনকে নতুন বেতন কাঠামোতে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও কর্মচারীর বর্তমান বেসিক বেতন ১৮,০০০ টাকা হয় এবং ৩.৮৩-এর ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ধরা হয়, তাহলে গণনার ফলাফল হবে ১৮,০০০ × ৩.৮৩ = ৬৮,৯৪০ টাকা, যা প্রায় ৬৯,০০০ টাকার সমান। তবে, এর মানে এই নয় যে প্রত্যেক কর্মচারীর নতুন বেসিক বেতন এইভাবেই নির্ধারিত হবে।
প্রকৃত বেতন কাঠামোর জন্য বেতন স্তর, ফিটমেন্ট রুল এবং কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। বর্তমানে এই দাবিগুলো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। অষ্টম বেতন কমিশন তার সুপারিশে পরিবারের সংজ্ঞা, পিতামাতার আর্থিক দায়িত্ব এবং ২০২৬ সালের পরিবর্তনশীল ব্যয়কে কতটা অন্তর্ভুক্ত করবে, তা এখনও দেখার বিষয়।