জন্ম কি আগে থেকেই ঠিক করা থাকে, নাকি জীবনের কর্মই ঠিক করে দেয় পরের পথ।মৃত্যুর পর কী হয়? মানুষ কি আবার জন্ম নেয়? যদি পুনর্জন্ম সত্যিই হয়ে থাকে, তা হলে পরের জন্মে মানুষ কী হয়? মানুষই, না কি অন্য কোনও প্রাণী? আর সেই জন্ম কি আগে থেকেই ঠিক করা থাকে, নাকি জীবনের কর্মই ঠিক করে দেয় পরের পথ?
হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শাস্ত্রে পুনর্জন্ম এবং কর্মফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যেই বার বার উঠে আসে ৮৪ লক্ষ যোনি-র কথা। পদ্ম পুরাণে জীবজগতের বিভিন্ন যোনির একটি শ্রেণিবিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্য দিকে, গরুড় পুরাণে কর্মের সঙ্গে মৃত্যুর পর জীবের গতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে ৮৪ লক্ষ যোনি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ধারণা রয়েছে, যার সবটাই সরাসরি শাস্ত্রে বলা হয়েছে এমন নয়। তাই বিষয়টি একটু সহজ করে বোঝা দরকার।
৮৪ লক্ষ যোনি বলতে কী বোঝায়?
পদ্ম পুরাণে একটি বিখ্যাত শ্লোকে জীবের বিভিন্ন যোনির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে জলচর, স্থাবর, কীটপতঙ্গ, পাখি, পশু এবং মানুষের বিভিন্ন শ্রেণির কথা বলা হয়েছে।
শ্লোকটির প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৯ লক্ষ জলচর, ২০ লক্ষ স্থাবর অর্থাৎ গাছপালা ও অন্যান্য স্থির জীব, ১১ লক্ষ কীট ও ক্ষুদ্র প্রাণী, ১০ লক্ষ পাখি, ৩০ লক্ষ পশু এবং ৪ লক্ষ মানবযোনির কথা বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৮৪ লক্ষ।
তবে এই সংখ্যাকে আধুনিক বিজ্ঞানের হিসাবে পৃথিবীর মোট প্রজাতির সংখ্যা হিসেবে দেখার কারণ নেই। এটি মূলত হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যে জীবজগতের বৈচিত্র্য বোঝানোর একটি ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ।
প্রত্যেক আত্মাকে কি ৮৪ লক্ষ যোনিতে জন্ম নিতে হয়?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে।
অনেকের ধারণা, প্রত্যেক আত্মাকে প্রথমে জলচর, তার পর গাছপালা, কীটপতঙ্গ, পাখি এবং পশুর জন্ম নিতে হয়। তার পরেই মানুষের জন্ম হয়। কিন্তু পদ্ম পুরাণের ওই শ্লোক থেকে এমন কোনও বাধ্যতামূলক ধাপের কথা সরাসরি পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ, প্রত্যেক আত্মাকে একে একে ৮৪ লক্ষ যোনিতে জন্ম নিতেই হবে; এমন স্পষ্ট নিয়ম ওই শ্লোকে নেই।
৮৪ লক্ষ যোনিকে বরং জীবজগতের বিভিন্ন অবস্থার একটি ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ হিসেবে দেখা হয়।
পরের জন্ম কীভাবে নির্ধারিত হয়?
হিন্দু দর্শনে কর্মের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মানুষের কাজ, চিন্তা, অভ্যাস এবং মানসিক প্রবণতা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন শাস্ত্রে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আত্মাকে নশ্বর শরীর থেকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ যেমন পুরনো পোশাক ছেড়ে নতুন পোশাক পরে, তেমনই আত্মা পুরনো শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর গ্রহণ করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে একটি নির্দিষ্ট কাজ করলেই পরের জন্মের রূপ সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। কর্মফল নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনায় মানুষের সামগ্রিক কর্ম, সংস্কার, আসক্তি এবং চেতনার কথাও গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুর সময়ের চিন্তাও কি গুরুত্বপূর্ণ?
ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ে মৃত্যুর সময়ের স্মরণ ও চেতনার গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তে তার মন কোন ভাবনায় স্থির রয়েছে, সেই বিষয়টিকেও সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই কারণেই হিন্দু ধর্মীয় দর্শনে শুধু একটি ভাল বা খারাপ কাজ দিয়ে পুরো পুনর্জন্মের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয় না। বরং মানুষের দীর্ঘ জীবনের কর্ম এবং মানসিক প্রবণতাকে একটি ধারাবাহিক যাত্রার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
পাপের জন্য কি নির্দিষ্ট পশুজন্ম হয়?
গরুড় পুরাণে বিভিন্ন কর্মের ফল এবং মৃত্যুর পর জীবের গতির কথা রয়েছে। গুরুতর পাপের ক্ষেত্রেও কঠিন কর্মফলের বর্ণনা পাওয়া যায়।
কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়; অমুক পাপ করলে অমুক পশুর জন্ম হয়, আবার অন্য একটি পাপ করলে অন্য প্রাণীর জন্ম হয়। এই ধরনের তালিকাকে সব ক্ষেত্রেই সরাসরি শাস্ত্রের নিয়ম বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গরুড় পুরাণের বিভিন্ন বর্ণনায় পাপের ফল, কষ্ট, নরক এবং পরবর্তী গতির মতো একাধিক বিষয় রয়েছে। তাই ‘একটি পাপ = একটি নির্দিষ্ট পশুজন্ম’; এমন সরল সূত্র দিয়ে পুরো শাস্ত্রীয় ধারণাকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
মানুষের জন্মকে এত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয় কেন?
হিন্দু ধর্মীয় দর্শনে মানুষের জন্মকে বিশেষ সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ মানুষ নিজের কাজ সম্পর্কে বিচার করতে পারে। ভাল-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে। নিজের জীবনযাত্রাও বদলানোর চেষ্টা করতে পারে।
মানুষ জ্ঞান অর্জন করতে পারে। দান করতে পারে। অন্যের সেবা করতে পারে। ভক্তি ও সাধনার পথে যেতে পারে। নিজের লোভ, রাগ এবং অহংকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।
এই কারণেই মানুষের জীবনকে শুধু খাওয়া, ঘুম এবং বেঁচে থাকার জন্য নয়, আত্মজ্ঞান অর্জনের সুযোগ হিসেবেও দেখা হয়।
মোক্ষ পেলে কি পুনর্জন্ম বন্ধ হয়?
হিন্দু ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল মোক্ষ। অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি।
শাস্ত্রে শুধু ভাল কোনও জন্ম পাওয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলা হয়নি। বরং কর্ম, জ্ঞান এবং ভক্তির মাধ্যমে আত্মিক উন্নতির কথা বলা হয়েছে।