Polygamy: ভারতে ব্যান হচ্ছে মুসলিমদের বহুবিবাহ? সুপ্রিম কোর্ট যা বলল

দেশে রাতারাতি বাতিল হয়েছিল তিন তালাক ব্যবস্থা। এবার কি তবে মুসলিমদের বহুবিবাহও বন্ধ হয়ে যাবে? একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দেওয়া মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সাংবিধানিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে ৫ জন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের জবাব চেয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত।

Advertisement
 ভারতে ব্যান হচ্ছে মুসলিমদের বহুবিবাহ? সুপ্রিম কোর্ট যা বলল
হাইলাইটস
  • মুসলিমদের বহুবিবাহ বন্ধ হয়ে যাবে?
  • মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সাংবিধানিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ
  • কেন্দ্রের জবাব চেয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত

প্রায় ন’বছর পর ফের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে বহুবিবাহের বৈধতা প্রশ্ন উঠল। একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দেওয়া মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সাংবিধানিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে ৫ জন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের জবাব চেয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। একইসঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের ক্ষেত্রে বহুবিবাহ বন্ধ করার জন্য আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করতে কেন্দ্রকে বলা হয়েছে।

এই মামলায় মূল প্রশ্ন উঠেছে, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে অনুমোদিত বহুবিবাহ কি সংবিধানের সমতার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? কারণ, একটি বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে সাধারণভাবে ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ৮২ ধারায় এমন দ্বিতীয় বিবাহের জন্য ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যদিও এই বিধান অ-মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কী দাবি করেছেন আবেদনকারীরা?
ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন (BMMA)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাকিয়া সোমান ও নূরজাহান সাফিয়া নিয়াজ-সহ ৫ জন সুপ্রিম কোর্টে যৌথ জনস্বার্থ মামলা করেছেন। তাঁদের দাবি, মুসলিম পুরুষের বহুবিবাহকে আইনিভাবে অপরাধের আওতায় আনা উচিত।

আবেদনকারীরা মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭-এর ২ নম্বর ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই আইনের মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে বহুবিবাহের যে স্বীকৃতি রয়েছে, তা সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে দেওয়া সমতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

জাকিয়া সোমান ২০১৭ সালের তিন তালাক মামলারও অন্যতম আবেদনকারী ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, মুসলিম মহিলাদের ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে হলে বহুবিবাহকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

আবেদনকারীরা মুসলিম বিবাহের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তিরও দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্য সরকারের কাছে বিবাহের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হলে প্রথম বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিবাহ ঠেকানো সম্ভব হবে।

এছাড়াও, দ্বিতীয় বিয়ে হলে প্রথম স্ত্রী ও তাঁর সন্তানদের শ্বশুরবাড়িতে অগ্রাধিকারমূলক ও স্থায়ী অধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকে সংবিধানের লিঙ্গসমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য আইন কমিশন বা কেন্দ্রকে একটি খসড়া আইন তৈরির নির্দেশ দেওয়ার আবেদনও করা হয়েছে।

Advertisement

তিন তালাকের মামলায় কী হয়েছিল?
২০১৭ সালে শায়েরা বানো বনাম কেন্দ্র সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিক তিন তালাককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের মুসলিম মহিলা (বিবাহের অধিকার সংরক্ষণ) আইনের মাধ্যমে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়।

তবে ২০১৭ সালের সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বহুবিবাহ এবং নিকাহ হালালার সাংবিধানিক বৈধতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে প্রায় ন’বছর পর বহুবিবাহের প্রশ্নটি নতুন করে আদালতের সামনে এসেছে।

নিকাহ হালালা বলতে এমন একটি প্রথাকে বোঝানো হয়, যেখানে বিবাহবিচ্ছিন্ন মুসলিম মহিলাকে প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে করার আগে অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করে সেই বিবাহ সম্পন্ন করতে হয় এবং পরে সেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আগের স্বামীকে বিয়ে করার সুযোগ তৈরি হয়।

আগের মামলাগুলিতে কী বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট?
১৯৯৫ সালের সরলা মুদগল বনাম কেন্দ্র সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, প্রথম বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিয়ে করার উদ্দেশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে হিন্দু স্বামীর করা দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ নয়।

২০০০ সালের লিলি থমাস বনাম কেন্দ্র সরকারের মামলাতেও আদালত সরলা মুদগল মামলার অবস্থান বজায় রাখে। অর্থাৎ, প্রথম বিবাহ বাতিল না করে কেবল আরও একটি বিয়ে করার উদ্দেশ্যে ধর্মান্তরিত হয়ে করা দ্বিতীয় বিবাহ বেআইনি এবং তৎকালীন ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় শাস্তিযোগ্য।

তবে এই দুই মামলাতেও মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে বহুবিবাহের মূল বৈধতা পরীক্ষা করা হয়নি।

২০২৩ সালে কী হয়েছিল?
২০২৩ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি পিএস নরসিংহ ও জেবি পারদিওয়ালার বেঞ্চ জানিয়েছিল, উপযুক্ত সময়ে মুসলিমদের মধ্যে বহুবিবাহ ও নিকাহ হালালার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে করা মামলাগুলি শুনতে নতুন ৫ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা হবে।

এরপর ৩০ অগাস্ট পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ—বিচারপতি ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত গুপ্ত, সূর্য কান্ত, এমএম সুন্দরেশ এবং সুধাংশু ধুলিয়া মামলাগুলিতে নোটিশ জারি করে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC), জাতীয় মহিলা কমিশন (NCW) এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন (NCM)-কেও মামলার পার্টি করা হয় এবং তাঁদের বক্তব্য চাওয়া হয়।

অ্যাডভোকেট অশ্বিনী উপাধ্যায়ও বহুবিবাহ, তিন তালাক এবং নিকাহ হালালার বিরুদ্ধে আবেদন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই প্রথাগুলি মহিলাদের জন্য ক্ষতিকর এবং সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

কোরানে কি বহুবিবাহকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে?
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, বহুবিবাহ মুসলিম ধর্মের এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্র্যাকটিস কি না, যা সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সুরক্ষা পেতে পারে।

আবেদনে কোরানের সুরাহ আন নিসার (৪:৩) উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনও পুরুষ যদি আশঙ্কা করেন, তিনি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবেন না, তাহলে তাঁর একজন স্ত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত।

আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, কোরান বহুবিবাহকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করে না। বরং বিশেষ ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে এর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁদের বক্তব্য।

কোরানে একজন পুরুষকে সর্বোচ্চ ৪ জন স্ত্রী রাখার অনুমতি দেওয়া হলেও স্ত্রীদের মধ্যে আর্থিক ও আবেগগত সমতা বজায় রাখার শর্ত রয়েছে। আবেদনকারীদের যুক্তি, সেই পূর্ণ সমতা বাস্তবে বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন।

কী হতে পারে?
মামলাটিতে সুপ্রিম কোর্টের সামনে সাংবিধানিক প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালত চাইলে ১৯৩৭ সালের শরিয়ত আইনের ২ নম্বর ধারার ব্যাখ্যা করে বহুবিবাহ ও নিকাহ হালালাকে সাংবিধানিক পরীক্ষার আওতায় আনতে পারে।

অন্যদিকে, বহুবিবাহ বন্ধ করতে কেন্দ্রকে স্পষ্ট আইন তৈরির পথও নেওয়া হতে পারে। ২০১৯ সালে তাৎক্ষণিক তিন তালাকের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যেমন আইন করা হয়েছিল, বহুবিবাহের ক্ষেত্রেও তেমন আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা থাকছে।

Advertisement

প্রায় ন’বছর আগে তিন তালাকের মামলায় যে সাংবিধানিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল, বহুবিবাহের এই নতুন চ্যালেঞ্জে ফের সামনে এসেছে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত আইন, লিঙ্গসমতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সীমারেখা। তবে বহুবিবাহের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও দেশের শীর্ষ আদালতের হাতে।

 

POST A COMMENT
Advertisement