এসআইআর নিয়ে কমিশনে মতানৈক্যদুই নির্বাচন কমিশনারকে কেন লিখিত আপত্তি জানাতে হল? নির্বাচন কমিশনের অন্দরে কি কারও একতরফা সিদ্ধান্তই চলছে? দুই নির্বাচন কমিশনার কেন অভিযোগ করলেন, নিয়ম মেনে কাজ হচ্ছে না? নতুন ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় কী ধরনের বাধা তৈরি করা হয়েছিল? ফর্ম-৬-এ কেন বদল আনা হল? দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার আইনি অধিকার যে নির্বাচনী আধিকারিকদের রয়েছে, তাঁদের ক্ষমতা কে এবং কেন সীমিত করল? কেন ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার, এমনকি একই দিনে চারবারও দুই নির্বাচন কমিশনারকে নিজেদের আপত্তি লিখিতভাবে নথিভুক্ত করতে হল? ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এমন সব বিস্ফোরক প্রশ্নই উঠে এসেছে।
'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' দাবি করেছে, এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল মতানৈক্য। ২০২৫ সালের জুনে বিহারে শুরু হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR)। ভোটার তালিকা সংশোধন ছিল যার উদ্দেশ্য। পরে এসআইআর হয় বাংলাতেও। সেই এসআইআরে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে খবর। প্রথম থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায়। কিন্তু প্রশ্ন শুধু বাইরে ওঠেনি, গত ১০ মাসে খোদ তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অন্দরেও উঠেছে প্রশ্ন। প্রশ্ন তুলেছেন দুই নির্বাচন কমিশনার, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী,তিন কমিশনারের তত্ত্বাবধানেই দেশজুড়ে এসআইআর চলেছে। নথি বলছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন সান্ধু এবং জোশী। তাঁদের অভিযোগ, না জানিয়ে বা সম্মতি ছাড়াই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জারি করা হয়েছে নির্দেশ। একই দিনে চারবার এমন আপত্তি নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংক্রান্ত সমস্ত আপত্তির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও। কয়েকটি আপত্তি তাঁর অধীনে থাকা ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারদের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। একটি লিখিত চিঠিতে সান্ধু অভিযোগ করেন, দুই কমিশনারের লিখিত পরামর্শের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে কমিশন। ওই পদক্ষেপ ছিল বেআইনি। এমনকি নজিরবিহীনভাবে সান্ধু এবং জোশী আলাদা আলাদা চিঠি লিখে ক্যাবিনেট সচিবের কাছেও অভিযোগ করেন।
বাংলায় এসআইআর নিয়ে প্রশ্ন
এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল বাংলায়। নির্বাচনের ফলে এসআইআরের প্রভাব পড়েছিল, এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি। ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৪৯টিতে এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল। ২৬টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। ২১টি আসনে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট এসআইআরের শেষ ধাপের একটি অংশ নির্বাচন কমিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে তুলে দেয়। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে কমিশন প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেয়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনতে অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দেয় আদালত।
বাংলার আপিল নিয়েও আপত্তি
গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানায়, ওই ট্রাইব্যুনালগুলির সামনে ৩৮ লক্ষ আপিল বিচারাধীন। এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ আপিল করেছেন বাদ পড়া ভোটাররা। যাঁরা নিজেদের নাম তালিকায় ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন। অন্য ১৬.১০ লক্ষ আপিল করা হয়েছে এমন ভোটারদের বিরুদ্ধে, যাঁদের বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এই আপিলগুলি কারা করেছেন, তা কমিশন জানায়নি।
এই বিষয়ে সান্ধুর আপত্তি ছিল। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা যাঁদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন আপিল করছে, এনিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। অগাস্টে কমিশনের আধিকারিকদের চিঠি লিখে সান্ধু জানতে চান, নির্বাচন কমিশনের হয়ে এই আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছিলেন? পাশাপাশি তাঁর প্রশ্ন ছিল,নির্বাচন কমিশনের হয়ে আদতে এই আপিলগুলি কে দায়ের করেছিলেন? এই আপিল দায়েরের ভিত্তি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁকে, জোশীকে বা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে কিছু জানানো হয়নি।
কমিশনের ব্যাখ্যা
দুই নির্বাচন কমিশনারের এসআইআরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপত্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে'মতপার্থক্য অস্বাভাবিক বিষয় নয়। আলোচনার প্রক্রিয়ায় ভিন্ন মত থাকা স্বাভাবিক। ওই প্রতিবেদনে ঘটনার মাত্র একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমিশনের এই বিবৃতিতে তিন সদস্যেরই স্বাক্ষর রয়েছে।