প্রাপ্তবয়স্ক কেউ স্বেচ্ছায় যৌনকর্মী হলে তা কোনও অপরাধ নয়। প্রাপ্তবয়স্ক কেউ স্বেচ্ছায় যৌনকর্মী হলে তা কোনও অপরাধ নয়। এমনকি পুলিশি অভিযানের সময়ও তাঁকে হেনস্থা বা আটক করা উচিত নয়। এমনই পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের। যৌনপাচারকারীদের শিকার হয়েছেন, এমন মহিলাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে এমনটা জানিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা, স্বেচ্ছায় যৌনকর্ম আর মানবপাচারের শিকার হওয়া, দু'টি এক নয়। সেই পার্থক্য মাথায় রেখেই আইন প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ, যৌনকর্মীরা সকলেই যে পাচারকারীদের হাতে পড়ে এই কাজে লিপ্ত হয়েছেন, তা নয়। ফলে কেউ স্বেচ্ছায়, রোজগারের জন্য যৌনকর্মী হলে, তিনি আইনের চোখে বেআইনি কিছু করছেন না।
বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের ডিভিশন বেঞ্চ ইমমোরাল ট্র্যাফিক (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট (ITPA)-এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে এই মন্তব্য করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যৌনকর্ম বেআইনি নয়। তবে মধুচক্র চালানো বা মানবপাচারের মতো কাজ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা বা ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছায় যৌনকর্মে যুক্ত থাকেন, তা হলে তাঁকে 'উদ্ধার' করার প্রশ্নই ওঠে না। আদালতের মতে, এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ বা প্রশাসনের তাঁদের বিরুদ্ধে একেবারেই অযথা পদক্ষেপ বা হেনস্থা করা চলবে না।
বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসনের অধিকার অবশ্যই একটি সাংবিধানিক অধিকার। তবে সেই পুনর্বাসন কখনও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনও যৌনকর্মী যদি পুনর্বাসন না চান, তা হলে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে(হোমে) পাঠানো বা অন্য কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়।
আদালত আরও বলেছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। কেউ যদি যৌনকর্মীই থাকতে চান, সেটা অপরাধ নয়। পুলিশের তাঁকে আগ বাড়িয়ে আটক করা বা হোমে পাঠানোর কোনও আইন নেই।
এদেশে বহু যৌনকর্মী মানবপাচার ও অসাধু চক্রের ফাঁদে পড়ে এই কাজে আসেন। তাঁদের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। তার শুনানির সময় এই রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানায়, প্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন, সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা বা হোমে পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত পুলিশ নিজে থেকেই নিতে পারে না। আগে তাঁদের সম্মতি নিতে হবে।
আদালত বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কিছু দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ITPA-র ১৭ নম্বর ধারার প্রয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, অনেক সময় পাচারের শিকার, জোর করে যৌনকর্মে বাধ্য হওয়া ব্যক্তি এবং স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে যুক্ত প্রাপ্তবয়স্কদের একই চোখে দেখা হয়। এই 'সবার জন্য একই নিয়ম' পদ্ধতি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সব সময় সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বিচারপতিদের মতে, প্রত্যেক ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। তাই কোনও ব্যক্তিকে পুনর্বাসন বা সুরক্ষাকেন্দ্রে পাঠানোর আগে তাঁর পরিস্থিতি, মতামত এবং সম্মতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। আদালত জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান জানানোই আইনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে আপনার কী বিশ্লেষণ? জানান কমেন্টে।