ফাইল ছবি কাউকে আটক করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানোর পর থেকে নয়, বরং যে মুহূর্তে কোনও ব্যক্তিকে আটক করা হচ্ছে, সেই সময় থেকেই শুরু হবে ২৪ ঘণ্টার হিসাব। অর্থাৎ, কাউকে কয়েক ঘণ্টা আটক রেখে পরে গ্রেফতার দেখিয়ে নতুন করে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা শুরু করার সুযোগ নেই। বৃহস্পতিবার এমনই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।
বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এবং বিচারপতি অতুল এস চন্দুরকরের বেঞ্চ জানায়, আটকের সময় এবং আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের সময়ের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য তৈরি করে বিচারবিভাগীয় নজরদারি এড়ানো যাবে না। সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদ এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ৫৬ নম্বর ধারায় যে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে, তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। আদালতের কথায়, কোনও মৌলিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যায় না।
সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে, আটকের পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা না হয়, তাহলে তাঁকে অবিলম্বে হেফাজত থেকে মুক্তি দিতে হবে। আটকের প্রকৃত সময় যাচাই করে এই নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটদের।
২৪ ঘণ্টার হিসাব কখন থেকে শুরু হবে?
সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। গ্রেফতারের স্থান থেকে আদালতে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় যাত্রার সময় বাদ দিয়ে ২৪ ঘণ্টার বেশি কাউকে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া হেফাজতে রাখা যায় না।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কাউকে প্রথমে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্ত চালানো হয়। তার পরে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়। এতদিন এই দুই সময়ের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে আটকের সময়টুকু ২৪ ঘণ্টার হিসাবের বাইরে রাখার প্রশ্ন উঠছিল। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, এমনটা করা যাবে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, আটকের পর থেকে আনুষ্ঠানিক গ্রেফতার দেখানোর আগের সময়ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গণনা করতে হবে। একমাত্র আদালতে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় যাত্রার সময়ই এই হিসাবের বাইরে থাকবে।
বেঞ্চ আরও জানিয়েছে, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদে 'গ্রেফতার' এবং 'হেফাজতে আটক' শব্দ দুটি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এই দুইয়ের মধ্যে এমন কোনও কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা যায় না, যার মাধ্যমে সংবিধান প্রদত্ত সুরক্ষা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
ম্যাজিস্ট্রেটদের কী দায়িত্ব দিল আদালত?
এই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদেরও বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কোনও ব্যক্তিকে আদালতে পেশ করার সময় তাঁর আটকের তারিখ এবং সঠিক সময় নথিভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি, আটকের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু গ্রেফতারের নথিতে উল্লেখ করা সময় দেখলেই হবে না। ব্যক্তি ঠিক কখন থেকে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
কোন মামলায় এই নির্দেশ?
ত্রিপুরা হাই কোর্টের একটি জামিনের আবেদন খারিজের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন চার ব্যক্তি। মাদকদ্রব্য ও মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ আইন (NDPS Act)-এর একটি মামলায় তাঁদের আটক করা হয়েছিল।
আদালতে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো নাগাদ তল্লাশি ও বাজেয়াপ্ত করার অভিযানের সময় ওই চারজনকে আটক করা হয়। কিন্তু তাঁদের আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের সময় নথিভুক্ত করা হয় পরের দিন, ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায়।
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো থেকেই ২৪ ঘণ্টার হিসাব শুরু হওয়া উচিত ছিল। সেই হিসাবে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টোর মধ্যে তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তার আগে প্রায় ১৮ ঘণ্টা তাঁরা বিচারবিভাগীয় নজরদারির বাইরে হেফাজতে ছিলেন।
বেঞ্চের মতে, এই প্রক্রিয়া সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সেই কারণেই চারজনকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশ?
আটক এবং আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের মধ্যে সময়ের ফারাক দেখিয়ে কাউকে দীর্ঘক্ষণ পুলিশের হেফাজতে রাখার সুযোগ বন্ধ করতেই সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। আদালত জানিয়েছে, তদন্তের প্রয়োজনে কতক্ষণ কাউকে আটকে রাখা যাবে, সেই সময়সীমা কে নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হলে সংবিধানের সুরক্ষাই দুর্বল হয়ে পড়বে।
হেফাজতে থাকাকালীন নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেছে আদালত। বিচারবিভাগীয় নজরদারির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বেঞ্চ জানিয়েছে, কোনও ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব হলে দ্রুত তাঁকে আদালতের নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।