ভারত-চিন সংঘর্ষ চলছে অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে একাধিক জায়গায় ভারতীয় ও চিনা সেনার মধ্যে সংঘাত চলছে। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানালেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের (ITBP) ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ কাপুর। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রথমবার সরকারি স্তরে উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল সীমান্তে চলতে থাকা সংঘাতের বিষয়টি প্রকাশ্যে এল। গত কয়েক মাস ধরেই এই অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে।
ITBP-র ডিজি জানিয়েছেন, গত জুলাই মাস থেকেই এই সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেই সময় খবর সামনে এসেছিল, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) বরাবর অরুণাচলের তাকসিং এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ টহলদারি পয়েন্টগুলিতে ভারতীয় সেনার প্রবেশে বাধা দিচ্ছে চিনা সেনা।
ITBP-র বার্ষিক সম্মেলনে শত্রুজিৎ কাপুর বলেন, 'গত কয়েক দিনে অরুণাচলের একাধিক জায়গায় মুখোমুখি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং তা এখনও চলছে।' তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত BRICS সম্মেলনের সময়ও ভারত ও চিনের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
অরুণাচল সীমান্তে ITBP-র শৌর্য কমান্ডোদের ভূমিকা
সংঘাতের পরিস্থিতিতে ITBP-র শৌর্য কমান্ডোদের ভূমিকায় প্রশংসা করেছেন বাহিনীর ডিজি। তিনি বলেন, 'নতুন করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শৌর্য কমান্ডোরা এই সংঘাতের সময়ে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।' উল্লেখ্য, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এই কমান্ডোরা।
গত কয়েক মাস ধরেই অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। জুলাই মাসে পিপলস পার্টি অফ অরুণাচল (PPA)-এর একটি তথ্য অনুসন্ধানকারী দল দাবি করেছিল, তাকসিং এলাকায় নির্দিষ্ট টহলদারি পয়েন্টগুলিতে ভারতীয় সেনার প্রবেশ কার্যত আটকে দিচ্ছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)। পাশাপাশি আপার সুবনসিরি জেলাতেও চিনের কার্যকলাপ বেড়েছে বলে দাবি করেছিল তারা।
PPA অরুণাচল প্রদেশের একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল। রাজ্য বিধানসভায় তাদের দু'জন বিধায়ক রয়েছেন। যদিও এই অভিযোগ খারিজ করেছিল সরকার। একইসঙ্গে সরকার স্পষ্ট জানিয়েছিল, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন কংগ্রেসের
অরুণাচল সীমান্তে চিনা সেনার সঙ্গে সংঘাতের বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে এই বিষয়ে জবাব চেয়েছে বিরোধী দল।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ইন্ডিয়া টুডে-কে জানিয়েছিলেন, অরুণাচল প্রদেশে চিন নতুন করে কোনও এলাকা দখল করেনি। তবে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পশুচারণের জমিতে প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এবার ITBP-র ডিজির বক্তব্যকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রের BJP সরকারকে আক্রমণ করেছে কংগ্রেস। দলের সাংসদ জয়রাম রমেশ এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করে অরুণাচল সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি লেখেন, চিনের প্রতি তথাকথিত বিশ্বগুরুর নিয়ন্ত্রিত ছাড় দেওয়ার নীতি অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, অরুণাচল প্রদেশে PLA-র সঙ্গে সাম্প্রতিক মুখোমুখি সংঘাতে ITBP-র ভূমিকার প্রশংসা করেছেন বাহিনীর ডিজি। কিন্তু এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর প্রশাসনের তরফে কার্যত নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর শান্তি বজায় রাখতে অনুষ্ঠিত কর্পস কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জয়রাম রমেশ। অরুণাচল প্রদেশের এই অঞ্চলে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার পর্যায়ের প্রথম ফ্ল্যাগ মিটিং।
জয়রাম রমেশ আরও দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছিলেন, লাদাখের মতো অরুণাচল প্রদেশেও ফের টহলদারি পয়েন্ট হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, চিন এখনও অরুণাচলের বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তন করে চলেছে। পাশাপাশি ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বাঁধ তৈরি করছে, যা ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জলনিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ডোকলাম এবং পূর্ব লাদাখের সংঘাতের পর ভারত ও চিনের মধ্যে ফের নতুন করে সীমান্ত বিবাদের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির মাঝেই অরুণাচল সীমান্তের এই উত্তেজনা কতটা বাড়ে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই দেশ কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর।