Human Brain : ভ্রুণ অবস্থা থেকে বৃদ্ধ বয়স, ১০০ টি মস্তিষ্ক নিয়ে থ্রি ডি ম্যাপ তৈরি হচ্ছে ভারতে, ব্যাপারটা কী?

বিশেষ ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এই গবেষণায়। মৃত্যুর পর সংগৃহীত মানুষের সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের নমুনা থেকে বিস্তারিত ছবি তৈরি করা হবে। তার পর সেই ছবিগুলিকে কম্পিউটারের সাহায্যে 3D মানচিত্রে রূপান্তর করা হবে।

Advertisement
ভ্রুণ অবস্থা থেকে বৃদ্ধ বয়স, ১০০ টি মস্তিষ্ক নিয়ে থ্রি ডি ম্যাপ তৈরি হচ্ছে ভারতে, ব্যাপারটা কী?মানুষের ব্রেন নিয়ে কাজ
হাইলাইটস
  • মানুষের ব্রেন নিয়ে কর্মকাণ্ড চলছে
  • বিজ্ঞানীরা কী করতে চাইছেন?

থ্রি ডি মুভি তো দেখেছেন। যেখানে মানুষের দুটি চোখ যেভাবে কোনো বস্তুকে আলাদা দুটি কোণ থেকে দেখে এবং মস্তিষ্ক তা মিলিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করে। এবার তৈরি হচ্ছে থ্রি ডি মস্তিষ্ক। তাও আবার মানুষের। যদিও তা দিয়ে মুভি তৈরি হবে না। গবেষণার কাজে লাগবে। 

 মানুষের মস্তিষ্কের ভিতরে কী রয়েছে? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে কী কী পরিবর্তন হয়? আবার স্ট্রোক হলে মস্তিষ্কের কোষের কী ক্ষতি হয়? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে IIT মাদ্রাজ। ১০০টিরও বেশি মানুষের মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিক বা 3D মানচিত্র তৈরি করবেন গবেষকরা। ভ্রূণাবস্থা থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত মস্তিষ্কের বিভিন্ন পর্যায় এই গবেষণায় তুলে ধরা হবে। রোগে আক্রান্ত মস্তিষ্কও থাকবে এই তালিকায়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের সূচনা করেছেন। IIT মাদ্রাজের সুদা গোপালকৃষ্ণন ব্রেন সেন্টার (SGBC) এই কাজ করছে। গবেষকদের দাবি, কোষের স্তরে মানুষের মস্তিষ্কের এত বড় 3D মানচিত্রের সংগ্রহ বিশ্বে এই প্রথম। এই গবেষণার তথ্য ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের কাজে লাগতে পারে।

কী ভাবে তৈরি হবে মস্তিষ্কের 3D মানচিত্র?

সাধারণত MRI স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভিতরের ছবি দেখা যায়। কিন্তু মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষের গঠন এবং তার পরিবর্তন বুঝতে আরও সূক্ষ্ম ছবি প্রয়োজন। IIT মাদ্রাজের গবেষকরা সেই কাজই করতে চলেছেন।

বিশেষ ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এই গবেষণায়। মৃত্যুর পর সংগৃহীত মানুষের সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের নমুনা থেকে বিস্তারিত ছবি তৈরি করা হবে। তার পর সেই ছবিগুলিকে কম্পিউটারের সাহায্যে 3D মানচিত্রে রূপান্তর করা হবে।

এর ফলে মস্তিষ্কের ভিতরের বিভিন্ন অংশ এবং কোষের বিন্যাস আরও স্পষ্ট ভাবে দেখা যাবে। বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠনে কী পরিবর্তন হয়, তা বুঝতেও সুবিধা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগে মস্তিষ্কের কোষ কী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা নিয়ে গবেষণা করা যাবে।

Advertisement

এই প্রকল্পে ২০০-রও বেশি গবেষক, ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিবিদ কাজ করবেন। ভারতের ১০টিরও বেশি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এই উদ্যোগে যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ১০টিরও বেশি দেশের ৩০-রও বেশি গবেষকও এই কাজে অংশ নেবেন।

স্ট্রোকে আক্রান্ত মস্তিষ্ক নিয়ে বিশেষ গবেষণা

এই উদ্যোগের পাশাপাশি IIT মাদ্রাজের গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সেটি হল C-STROKE। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই স্ট্রোক অ্যাটলাস প্রকাশ করেছেন। IIT মাদ্রাজের দাবি, মানুষের ইস্কেমিক স্ট্রোক নিয়ে এটিই বিশ্বের প্রথম 3D অ্যাটলাস।

ইস্কেমিক স্ট্রোক হয় যখন মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোনও রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছতে পারে না। তখন কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে।

সাধারণত MRI স্ক্যানের মাধ্যমে চিকিৎসকরা মস্তিষ্কে স্ট্রোকের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষতি শনাক্ত করেন। কিন্তু এই স্ক্যানে মস্তিষ্কের অতি সূক্ষ্ম কোষগত পরিবর্তন সব সময় স্পষ্ট হয় না। C-STROKE সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করবে।

এই অ্যাটলাসে স্ট্রোকে আক্রান্ত একটি মস্তিষ্কের ১,০০০টিরও বেশি টিস্যু-সেকশন বা কলার অংশের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। এই অংশগুলিতে বিভিন্ন পরিবর্তন চিহ্নিত করা হয়েছে। কোথায় স্নায়ুকোষ সুস্থ রয়েছে, কোথায় প্রদাহ তৈরি হয়েছে, কোথায় অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা যাবে। এ ছাড়াও, মস্তিষ্কের রক্ত-মস্তিষ্ক বাধা বা ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ারের ক্ষতি এবং স্নায়ুতন্তুর আঘাত নিয়েও গবেষণা করা হবে।

MRI স্ক্যানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে কোষের ক্ষতি

এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মস্তিষ্কের MRI স্ক্যানের ছবির সঙ্গে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা টিস্যুর ছবি মিলিয়ে দেখা যাবে। MRI স্ক্যানে সাধারণত মিলিমিটার স্তরে মস্তিষ্কের গঠন দেখা যায়। অন্যদিকে, টিস্যুর অতি সূক্ষ্ম পরীক্ষায় মাইক্রন স্তরে কোষের পরিবর্তন বোঝা সম্ভব। এক মাইক্রন হল এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ।

এই দুই ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে মস্তিষ্কের কোন অংশে কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা আরও ভালো ভাবে বোঝা যেতে পারে। স্ট্রোকের পর মস্তিষ্কের ভিতরে কী কী পরিবর্তন ঘটে, তা নিয়েও নতুন তথ্য মিলতে পারে।

গবেষকদের আশা, এই তথ্য ভবিষ্যতে স্ট্রোকের ক্ষতি নিয়ে গবেষণায় সাহায্য করবে। মস্তিষ্কের কোন পরিবর্তন রোগের সঙ্গে যুক্ত, তা চিহ্নিত করতেও সুবিধা হতে পারে। তবে এই গবেষণার ফলে এখনই নতুন কোনও চিকিৎসা আবিষ্কার হয়েছে, এমন দাবি করা হচ্ছে না।

গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সুপারকম্পিউটার

এত বিপুল পরিমাণ ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারের প্রয়োজন। এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ‘পরম শক্তি’  সুপারকম্পিউটার। কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের সহায়তায় এই পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে।

গবেষণার তথ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য অনলাইন ভিউয়ার এবং তথ্য বিশ্লেষণের বিশেষ সরঞ্জামও তৈরি করা হয়েছে। ফলে গবেষকরা নিজেদের জায়গায় বসেই এই মানচিত্র দেখতে এবং তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

আগের গবেষণার পরিধিও বাড়ছে

IIT মাদ্রাজের এই উদ্যোগ একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে DHARANI নামে একটি ব্রেন অ্যাটলাস প্রকাশ করা হয়েছিল। তাতে পাঁচটি ভ্রূণের মস্তিষ্কের ৫,১৩২টি টিস্যু-সেকশনের তথ্য রয়েছে।

এবারের উদ্যোগে সেই গবেষণার পরিধি আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শুধু ভ্রূণের মস্তিষ্ক নয়, মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মস্তিষ্কের গঠন কেমন থাকে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

IIT মাদ্রাজের সুদা গোপালকৃষ্ণন ব্রেন সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক মোহনশঙ্কর শিবপ্রকাশম জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে মস্তিষ্কবিজ্ঞান, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কম্পিউটিংকে একসঙ্গে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ আগামী কয়েক দশকে স্নায়ুবিজ্ঞান ও স্নায়ুরোগের চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

Advertisement

সব মিলিয়ে, IIT মাদ্রাজের লক্ষ্য মানুষের মস্তিষ্ককে আরও গভীর ভাবে বোঝা। কোষের স্তরে মস্তিষ্কের গঠন এবং তার পরিবর্তনের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্নায়ুরোগ নিয়ে গবেষণায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্ট্রোকের মতো রোগে মস্তিষ্কের ক্ষতি কী ভাবে হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই গবেষণার বাস্তব চিকিৎসাগত সুফল পেতে আরও পরীক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজন হবে।

POST A COMMENT
Advertisement