ফর্ম ৬ নিয়ে কী বদল কমিশনের, জানুন।ফর্ম ৬ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই। ওই ফর্মে ডিক্লারেশনের অংশটি নিয়ে নোটও দিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু আর বিবেক জোশী। এ রাজ্যে ফর্ম ৬ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ফর্মেই এল বদল। নতুন করে এই কী পরিবর্তন আনা হয়েছে? শর্ত যুক্ত করা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত কীভাবে? দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সান্ধু ঠিক কী আপত্তি জানিয়েছিলেন? তাঁদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কী পদক্ষেপ করেছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া যাক।
নির্বাচন কমিশনের ফর্ম ৬ কী?
ফর্ম ৬ হল প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনপত্র। ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস অনুযায়ী এই ফর্ম চালু রয়েছে। এতে কোনও পরিবর্তন করতে হলে তা একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারই করতে পারে। অন্য কোনও সংস্থা, এমনকি নির্বাচন কমিশনও একতরফাভাবে ফর্মে পরিবর্তন আনতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন করা হয়েছিল। ফর্মে নতুন একটি ঘোষণা বা ডিক্লারেশন যুক্ত করা হয়। সেখানে নতুন ভোটারদের তিনটি বিকল্পের মধ্যে যে কোনও একটি বেছে নিতে বলা হয়েছিল।
১। আগের এসআইআরে ভোটার তালিকায় কি আবেদনকারীর নিজের নাম ছিল?
২। ওই তালিকায় কি তাঁর বাবা-মা বা ঠাকুরদা-ঠাকুরমা বা দাদু-দিদার নাম ছিল?
৩। ওই তালিকায় তাঁদের কারওর নামই ছিল না?
আপত্তি তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার
বিতর্কের মূল কারণ ছিল, এই ঘোষণা পূরণ না করলে অনলাইনে ফর্মের পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব হচ্ছিল না। অভিযোগ, চলতি বছরের মে মাসে এই নতুন ডিক্লারেশন যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ১৬ মে নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী নোটে স্পষ্ট লিখেছিলেন, আইনি সংশোধন ছাড়া ফর্মে এই ধরনের পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ১৩ অগাস্ট কড়া ভাষায় নিজের আপত্তির কথা জানান দ্বিতীয় নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধুও। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই পরিবর্তন অননুমোদিত এবং বেআইনি। অবিলম্বে পোর্টাল থেকে এটি সরিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু অভিযোগ, সমস্ত আপত্তি উপেক্ষা করেই আগের মতো কাজ চলতে থাকে। অথচ আইন অনুযায়ী, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের কোনও সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে বা ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া প্রয়োজন।
কমিশনের ব্যাখ্যা কী ছিল?
একটি ইংরেজি দৈনিকে 'মতানৈক্যের খবর' প্রকাশ্যে আসার পর ২৩ সেপ্টেম্বর কমিশনের তরফে জানানো হয়, সমস্ত কাজই আইনের আওতায় হয়েছে। কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য বা আপত্তি স্বাভাবিক বিষয়। সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে সমস্ত সিদ্ধান্ত। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন জানায়, যে সমস্ত রাজ্যে এসআইআরের কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে, সেখান থেকে নতুন ডিক্লারেশন সরিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি কমিশনের দাবি ছিল, সুপ্রিম কোর্টও এই ডিক্লারেশনকে বৈধ বলে মেনে নিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট কী বলেছিল?
এর পর আসে ১২ অক্টোবর। ওই দিন সুপ্রিম কোর্টের একটি পর্যবেক্ষণে নির্বাচন কমিশনের দাবি নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা সংশোধিত ফর্মটিকে অনুমোদনও করেনি, আবার খারিজও করেনি। আদালতের এই মন্তব্যের পর ২১ অক্টোবর ফের নতুন ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। জানানো হয়, এসআইআরের সময় ডিক্লারেশনটি ফর্ম ৬ থেকে আলাদা করে দেওয়া হবে।
ফর্ম ৬ আর এসআইআর ডিক্লারেশন আলাদা
নির্বাচন কমিশনের ECI Net পোর্টালে গেলে দেখা যাচ্ছে, ফর্ম ৬ আলাদা রয়েছে। অন্যদিকে, এসআইআর সংক্রান্ত ডিক্লারেশনটি সম্পূর্ণ পৃথক একটি ফর্ম হিসেবে রাখা হয়েছে।
গোটা ঘটনাক্রম থেকে কী বোঝা গেল?
মে মাসে বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সান্ধু যে বিষয়গুলি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন, প্রায় পাঁচ মাস পর কার্যত সেই বিষয়েই অবস্থান বদল করল কমিশন। তবে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে একটি যুক্তিও দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে কমিশন জানায়, তারা কখনও ফর্ম ৬ সংশোধন করেনি। কোনও পরিবর্তনও করেনি। শুধুমাত্র ভোটারদের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এসআইআর সংক্রান্ত ডিক্লারেশনটি যুক্ত করা হয়েছিল। কমিশনের বক্তব্য, ফর্ম ৬ এবং এসআইার ডিক্লারেশনের জন্য আলাদা করে দুবার OTP এবং দুবার ই-সিগনেচার দিতে যাতে না হয়, সেই কারণেই দুটিকে একসঙ্গে রাখা হয়েছিল। ভোটারদের সুবিধার কথা ভেবেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে দাবি কমিশনের।