এল নিনোর প্রভাব পড়বে মাছের বাজারে এল নিনোর প্রভাব আর শুধু আবহাওয়ার চরম পরিস্থিতি কিংবা ভারতের বর্ষার উপরেই সীমাবদ্ধ রইল না। এর প্রভাব পড়তে পারে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার উপরেও। প্রশান্ত মহাসাগরের জল ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠায় সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, বদলে যেতে পারে মাছের বসবাসের জায়গা। এমনকী বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাছের জোগানও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হল, এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালে ভারতীয় সার্ডিনের জোগান কমতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চের অধীনস্থ সেন্ট্রাল মেরিন ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CMFRI)।
ভারত জনবহুল দেশ। ফলে দেশের মৎস্যসম্পদ এবং মাছের জোগানের উপর সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রভাব নজরে রাখা জরুরি। CMFRI-এর সতর্কতা অনুযায়ী, এল নিনোর পরিস্থিতি শক্তিশালী হলে তার প্রভাব উত্তর ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে ২০২৭ সালে ভারতীয় তেল সার্ডিনের জোগান কমার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতে মাছের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
কীভাবে সামুদ্রিক জীবনে প্রভাব ফেলে এল নিনো?
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে সমুদ্রের জলপ্রবাহ এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। এল নিনোর অন্যতম প্রভাব হল সমুদ্রের গভীর থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ জল উপরে উঠে আসার প্রক্রিয়া বা ‘আপওয়েলিং’ ব্যাহত হওয়া। দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ জল উপরে উঠে আসে। এই জল ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন হল অতি ক্ষুদ্র জীব, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি। এল নিনোর কারণে আপওয়েলিং দুর্বল হয়ে পড়লে প্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধি কমতে পারে। ফলে মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর খাবারের জোগানও কমে যায়।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, ১৯৮২-৮৩ এবং ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে প্ল্যাঙ্কটনের ব্যাপক বৃদ্ধির সময়ে এবং মাছের লার্ভার প্রাথমিক খাদ্যগ্রহণের পর্যায়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছিল। এই অসামঞ্জস্যের ফলে মাছের লার্ভার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়তে পারে মাছ ধরার পরিমাণের উপরেও। অর্থাৎ, সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়ে উঠলে সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খলও ব্যাহত হতে পারে।
ভারতের সার্ডিন ও ম্যাকারেলও কি বিপদে?
ভারতের সামুদ্রিক মৎস্যক্ষেত্রের পরিস্থিতি দক্ষিণ আমেরিকার থেকে আলাদা। তবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখানেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে CMFRI সতর্ক করেছিল, এল নিনো সম্পর্কিত উষ্ণতা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়াতে পারে। এর ফলে ২০২৭ সালে ভারতীয় তেল সার্ডিনের জোগান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রভাব আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাস নাগাদ উত্তর ভারত মহাসাগরেও অনুভূত হতে পারে।
ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশান ইনফরমেশন সার্ভিসেস (INCOIS)-ও সতর্ক করেছে, আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে তাপজনিত চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সার্ডিন এবং ভারতীয় ম্যাকারেলের মতো মাছের উপর। সমুদ্রের তাপমাত্রা বদলে গেলে মাছ তুলনামূলক উপযুক্ত পরিবেশের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যেতে পারে। ফলে পরিচিত মাছ ধরার জায়গাগুলিতে তাদের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এমনকী মাছের স্বাভাবিক আকারেও প্রভাব পড়তে পারে।
মৎস্যজীবী থেকে মাছের বাজার, প্রভাব পড়তে পারে সর্বত্র
এল নিনোর প্রভাব শুধু যে এলাকায় মাছ ধরা হয়, সেখানকার মৎস্যজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসেবে পেরুর অ্যাঙ্কোভেটা মাছের কথা বলা যায়। এই মাছ বিশ্বে ফিশমিল উৎপাদনের একটি বড় অংশের জোগান দেয়। অ্যাকোয়াকালচার বা মাছ চাষের খাবার তৈরিতে ফিশমিল ব্যবহার করা হয়। ফলে অ্যাঙ্কোভেটা মাছের জোগান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে ফিশমিলের সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে অন্য জায়গার মাছচাষিদের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে তেল সার্ডিন বা ম্যাকারেলের জোগান কমে গেলে মৎস্যজীবীদের আয়, উপকূলীয় বাজার এবং সস্তায় মাছ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে। তবে মাছের দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে জোগান কতটা কমছে, ক্রেতাদের চাহিদা কেমন থাকছে, বিকল্প উৎস থেকে মাছ পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং মৎস্যজীবী ও ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারছেন, তার উপর।
তবে এল নিনোই সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের একমাত্র সমস্যা নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং সামুদ্রিক বাসস্থানের ক্ষতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই সমস্ত কারণ একসঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশের উপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই আগামী কয়েক মাস ভারতের ক্ষেত্রে সমুদ্রের তাপমাত্রা, সামুদ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং মাছ ধরার পরিমাণের উপর নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশান্ত মহাসাগরের জল যত উষ্ণ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, এল নিনোর প্রভাব শুধু ভারতের বর্ষাতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। দেশের মৎস্যসম্পদ এবং মাছের জোগানেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।