মেট্রোয় যাত্রীদের সঙ্গেই সফর করছে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া, কেন সতর্ক থাকা জরুরি?

ম্প্রতি আইআইটি মাদ্রাজের একটি গবেষণায় চেন্নাই মেট্রোর বিভিন্ন স্টেশন ও ট্রেনের নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিনের সন্ধান মিলেছে। শুধু চেন্নাই নয়, দিল্লির রেলস্টেশনের বাতাসেও আগের একটি গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের অণুজীব ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত জিনের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল।

Advertisement
মেট্রোয় যাত্রীদের সঙ্গেই সফর করছে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া, কেন সতর্ক থাকা জরুরি?ছবি : PTI
হাইলাইটস
  • গবেষণার আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল
  • ট্রেনের হাতলের তুলনায় টিকিট বিক্রির মেশিনে বেশি ধরনের অণুজীবের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে

মেট্রো বা ট্রেনে প্রতিদিন যাতায়াত করেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। অফিস যাওয়ার তাড়া, ভিড়ের মধ্যে ওঠানামা, টিকিট কাটার জন্য মেশিনে হাত দেওয়া কিংবা ট্রেনের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা, সবই রোজকার অভ্যাস। কিন্তু এই পরিচিত জায়গাগুলিতেই যদি এমন কিছু জীবাণুর জিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যেগুলি অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, তা হলে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সম্প্রতি আইআইটি মাদ্রাজের একটি গবেষণায় চেন্নাই মেট্রোর বিভিন্ন স্টেশন ও ট্রেনের নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিনের সন্ধান মিলেছে। শুধু চেন্নাই নয়, দিল্লির রেলস্টেশনের বাতাসেও আগের একটি গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের অণুজীব ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত জিনের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল।

তবে গবেষণার এই ফলাফল শুনে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ, গবেষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, অণুজীবের DNA বা জিনগত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া মানেই যে সেখানে জীবিত, সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম জীবাণু রয়েছে, তা নয়। তা হলে ঠিক কী পাওয়া গিয়েছে গবেষণায়? যাত্রীদের জন্যই বা কতটা উদ্বেগের বিষয় এটি?

চেন্নাই মেট্রোর ৯৬টি নমুনায় কী মিলল?

আইআইটি মাদ্রাজের গবেষকরা চেন্নাই মেট্রোর ব্লু ও গ্রিন লাইনের ট্রেন এবং ১২টি স্টেশন থেকে মোট ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৪১টি নমুনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জিনগত উপাদান পাওয়া যায়। সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিন বা ARGs-এর ৭২টি পরিবার শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৮০ শতাংশের বেশি নমুনায় অন্তত একটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিনের উপস্থিতি রয়েছে। এই ধরনের জিন ব্যাকটেরিয়াকে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ফলে কোনও কোনও ব্যাকটেরিয়ার কারণে সংক্রমণ হলে তার চিকিৎসা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

গবেষণায় রিফামাইসিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত জিনগত চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে। এই গ্রুপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হল রিফ্যাম্পিসিন। যক্ষ্মা বা টিবি রোগের চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
টিকিট কাটার মেশিনে বেশি ধরনের অণুজীব!

Advertisement

গবেষণার আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, ট্রেনের হাতলের তুলনায় টিকিট বিক্রির মেশিনে বেশি ধরনের অণুজীবের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। প্রায় ৩০ ধরনের অণুজীব প্রায় প্রতিটি নমুনাতেই শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে এমন ব্যাকটেরিয়াও রয়েছে, যেগুলি সাধারণত মানুষের ত্বক, মাটি ও জলে পাওয়া যায়।

তবে অণুজীবের উপস্থিতি মানেই সেগুলি ক্ষতিকর, এমন নয়। দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা ধরনের অণুজীবের সংস্পর্শে আসি। তাদের অধিকাংশই মানুষের শরীরের ক্ষতি করে না। এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যেগুলি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের শরীরেও বসবাস করে।

এখানে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষকরা নমুনায় থাকা ব্যাকটেরিয়ার DNA পরীক্ষা করেছেন। ব্যাকটেরিয়াগুলি জীবিত কি না, কিংবা সেগুলি সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম কি না, তা পরীক্ষা করা হয়নি। তাই এই গবেষণা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না যে চেন্নাই মেট্রোয় যাতায়াত করলেই যাত্রীরা ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন।

শুধু চেন্নাই নয়, দিল্লির রেলস্টেশনেও মিলেছে জীবাণু

গণপরিবহণে অণুজীবের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শুধু চেন্নাইয়ের গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে 'সায়েন্স অফ দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট' জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দিল্লির রেলস্টেশনগুলির বাতাসে থাকা অণুজীব পরীক্ষা করা হয়েছিল।

সেই গবেষণায় সিউডোমোনাস ও মোরাক্সেলার মতো ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া যায়। পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এবং রোগ ছড়ানোর ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত কিছু জিনও শনাক্ত হয়েছিল। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তাপমাত্রা, বাতাসের গুণমান এবং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে থাকা অণুজীবের ধরনও বদলে যেতে পারে।

তবে চেন্নাই ও দিল্লির গবেষণার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। চেন্নাইয়ে যাত্রীরা যে সব জায়গায় হাত দেন, সেই ধরনের বিভিন্ন পৃষ্ঠতল থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। অন্যদিকে দিল্লির গবেষণায় রেলস্টেশনের বাতাসে থাকা অণুজীব পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ, গণপরিবহণে যাতায়াতের সময় মানুষ বিভিন্ন উপায়ে অণুজীবের সংস্পর্শে আসতে পারেন, এই দুই গবেষণা সেই বিষয়টি সামনে এনেছে।

যাত্রীদের সংক্রমণের আশঙ্কা কতটা?

গবেষণার ফলাফল থেকে গণপরিবহণে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার গুরুত্ব আরও একবার সামনে এসেছে। তবে এই গবেষণাগুলির কোনওটিতেই প্রমাণিত হয়নি যে সংশ্লিষ্ট স্টেশন বা ট্রেনে যাতায়াত করার কারণে যাত্রীরা সংক্রমিত হচ্ছেন। বিশেষ করে চেন্নাইয়ের গবেষণায় জীবিত ব্যাকটেরিয়া বা তাদের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়নি।

তাই যাত্রীদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেমন, খাবার খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধোয়া, মেট্রো বা ট্রেন থেকে নামার পর হাত পরিষ্কার করা এবং অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ না করা। অন্যদিকে পরিবহণ কর্তৃপক্ষেরও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি পর্যবেক্ষণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

গবেষণাগুলি মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে: প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের ব্যবহার করা ভারতের গণপরিবহণ ব্যবস্থায় অণুজীবের উপস্থিতি কতটা নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হয়? শুধু চোখে দেখা ময়লা পরিষ্কার করাই যথেষ্ট কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, অণুজীবের DNA পাওয়া এবং সংক্রমণ ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া এক বিষয় নয়।

POST A COMMENT
Advertisement