
অরুণাচলের ছবি অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার প্রত্যন্ত এলাকা তাকসিং। একসময় সেখানে পৌঁছতে কয়েক দিন ধরে পায়ে হেঁটে যেতে হত। দুর্গম এই এলাকাই এখন ভারত ও চিনের সীমান্ত বিবাদ ঘিরে আলোচনায়। চিনা সেনার সঙ্গে ভারতীয় সেনার মুখোমুখি হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। কয়েকটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডের ৬-৭ কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে পড়েছে চিনা সেনা। কোথাও আবার অনুপ্রবেশের দূরত্ব ৪০-৫০ কিলোমিটার বলেও দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এই দাবির সত্যতা কতটা?
ইন্ডিয়া টুডে-র ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) টিম মানচিত্র, স্যাটেলাইট ছবি এবং প্রকাশ্যে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য খতিয়ে দেখে এই এলাকার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছে। সেই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্তের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মানচিত্রে অমিল, ভারতের দিকে সড়ক যোগাযোগের অভাব এবং চিনের দিকে দ্রুত বাড়তে থাকা পরিকাঠামো।
৬-৭ কিলোমিটার অনুপ্রবেশের দাবির সত্যতা কী?
কয়েকটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, চিনা সেনা ভারতীয় এলাকায় ৬-৭ কিলোমিটার ঢুকে পড়েছে। অন্য কয়েকটি রিপোর্টে এই দূরত্ব ৪০-৫০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই দূরত্ব কোথা থেকে মাপা হচ্ছে এবং প্রকৃত সীমান্তরেখা কোথায়, তা স্পষ্ট না হলে এমন দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন।
অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, মাজার উত্তরের একটি এলাকা ১৯৫৯ সাল থেকে চিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে সামরিক উপস্থিতি ও পরিকাঠামো বাড়িয়েছে চিন। অন্যদিকে, পুকুরলা রয়েছে ওই এলাকার দক্ষিণ দিকে। মাজার কাছে ভারতের সড়ক, হেলিপ্যাড এবং সেনার উপস্থিতি রয়েছে।
চিনা সেনা যদি সত্যিই মাজার ভারতীয় পোস্ট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ত, তা হলে বিষয়টি শুধু টহল দেওয়ার সময় দুই দেশের সেনার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা থাকত না। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া ছবি ও তথ্য থেকে এমন ঘটনার কোনও প্রমাণ মেলেনি। ফলে টহল দেওয়ার সময় পুকুরলার পশ্চিম দিকে অথবা তাকসিংয়ের আশপাশে দুই দেশের সেনার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

পুকুরলার উত্তরে গত কয়েক বছরে চিন নিজেদের উপস্থিতি এবং পরিকাঠামো বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের দিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। আগে তাকসিংয়ের আশপাশে চিনের উপস্থিতি এতটা আগ্রাসী ছিল না বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় জনজাতির মানুষদের তীর্থযাত্রার জন্য চিনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় যাওয়ার অনুমতিও দেওয়া হত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ওই অঞ্চলে নজরদারি ও সীমান্তে কড়াকড়ি বেড়েছে বলে খবর।
পূর্ব লাদাখের মতো পরিস্থিতি কি তৈরি হচ্ছে?
২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চিনের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাকসিংয়ের আশপাশের স্যাটেলাইট ছবিতে সেই সময়ের মতো বড় মাপের সামরিক তৎপরতার ছবি পাওয়া যায়নি। তবে এই এলাকার স্যাটেলাইট ছবির রেজোলিউশন কম এবং বিস্তীর্ণ অংশ ঘন সবুজে ঢাকা। ফলে অল্প সংখ্যক সেনার চলাচল বা ছোটখাটো সামরিক গতিবিধি শনাক্ত করা কঠিন।
ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা ITBP-র DG শত্রুজিৎ সিং কাপুরও জানিয়েছিলেন, অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় চিনা সেনার সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্য কোনও একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বদলে সীমান্তে এ ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতার দিকে ইঙ্গিত করেছিল বলে অনুসন্ধানে বলা হয়েছে।
ভারত ও আমেরিকার মানচিত্রে কেন অমিল?
তাকসিংয়ের পরিস্থিতি বুঝতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC-এর স্পষ্ট মানচিত্রের অভাব। ভারত ও চিনের মধ্যে LAC-কে নিয়ন্ত্রণের একটি ধারণা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গোটা সীমান্তের জন্য এমন কোনও স্পষ্ট মানচিত্র প্রকাশ্যে নেই, যেখানে দুই দেশের অবস্থান নির্দিষ্ট করে দেখানো হয়েছে। মাটিতেও সর্বত্র সীমান্ত চিহ্নিত করা নেই।
অরুণাচল প্রদেশে ভারত ১৯১৪ সালের সিমলা সম্মেলনে নির্ধারিত ম্যাকমোহন লাইনকে চিনের সঙ্গে সীমান্ত হিসেবে মানে। সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মানচিত্রে এই রেখার ভিত্তিতেই ভারতের সীমানা দেখানো হয়েছে। কিন্তু ওই মানচিত্রে কয়েকটি জায়গায় ভারতীয় ভূখণ্ডের অংশ ভারতের সীমানার বাইরে চলে গিয়েছে বলে দেখা যায়।
আমেরিকার ভূগোলবিদদের তৈরি মানচিত্রেও ম্যাকমোহন লাইনকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেটির সঙ্গেও সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মানচিত্রের একাধিক জায়গায় অমিল রয়েছে। তাকসিংয়ে অন্তত একটি ভারতীয় সেনা পোস্ট, নির্মীয়মাণ রাস্তার একটি অংশ এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের কিছু অংশ সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মানচিত্রে ভারতের সীমানার বাইরে দেখানো হয়েছে। আমেরিকার মানচিত্রে ওই জায়গাগুলি ভারতের মধ্যে পড়লেও অন্য কিছু জায়গায় ভারতীয় ভূখণ্ডের অংশ চিনের দিকে দেখানো হয়েছে।
উত্তর-পূর্বে পুকুরলা এবং আরও উত্তরে লংজু এলাকার মানচিত্রেও অমিল রয়েছে। লংজুতে ১৯৫৯ সাল থেকে চিনের সামরিক উপস্থিতি ও পরিকাঠামো রয়েছে। অনলাইন মানচিত্র ওপেনস্ট্রিটম্যাপেও এই অমিলের সমাধান পাওয়া যায়নি।
পাঁচটি জায়গায় অনুপ্রবেশের অভিযোগ
নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (NWS) নামে একটি সংগঠন পাঁচটি জায়গায় চিনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছিল। জায়গাগুলি হল আসাফিলার ওইং, চুজার্তার পানিয়ার, মারপান, পোটরাং হ্রদ এবং টিনডিংটাং। তবে ভারতীয় সেনা এই অভিযোগ খারিজ করে জানায়, এ ধরনের কোনও অনুপ্রবেশ ঘটেনি।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও জানিয়েছিল, চিনা সেনা নির্ধারিত টহলের পথ থেকে সরে গেলে সীমান্তে দুই দেশের বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। অন্যদিকে, চিন তাদের টহলকে নিয়মিত বলে দাবি করেছে। ফলে সীমান্তে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটলেই তাকে সরাসরি অনুপ্রবেশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। সংশ্লিষ্ট এলাকার সীমান্তরেখা এবং দুই দেশের দাবির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।

তাকসিংয়ে পৌঁছতে ভারতের কতটা রাস্তা রয়েছে?
সীমান্তে সেনার উপস্থিতি বজায় রাখা এবং দ্রুত রসদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকসিংয়ের আশপাশে ভারত অন্তত সাতটি সড়ক যোগাযোগের পরিকল্পনা করেছে বা কাজ শুরু করেছে। কিন্তু অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এর মধ্যে তামা চুং চুং (TCC)-তাকসিং সড়কটিই সম্পূর্ণ হয়েছে।
তাকসিং-ঘোরা ক্যাম্প-লুং অপারেশনাল পোস্ট পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার কাজ ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও রাস্তার উপরিভাগ তৈরির কাজের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া চলছিল। ফলে রাস্তাটি ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মানচিত্র অনুযায়ী লুং অপারেশনাল পোস্টটি ভারতের চিহ্নিত সীমানার বাইরে পড়ে।
এ ছাড়া ৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হুরি-তাকসিং সড়ক এখনও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। আরও দুটি সড়ক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে এবং দুটি রাস্তা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। লংজু এলাকার দিকে ভারতের রাস্তা মজা পর্যন্ত পৌঁছেছে। মজা চিনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে। তার পরের দিকে সড়ক যোগাযোগ সীমিত হয়ে যায়।
চিনের দিকে তৈরি হয়েছে সড়ক ও সামরিক পরিকাঠামো
তাকসিংয়ের বিপরীতে চিনের দিকে ছবিটা আলাদা। লংজু থেকে শুরু করে তাকসিংয়ের সামনের এলাকা পর্যন্ত সড়ক এবং আধুনিক পরিকাঠামোর নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সেখানে নতুন গ্রাম, হেলিপ্যাড এবং সীমান্তের কাছে একটি সামরিক পোস্ট কমপ্লেক্সও তৈরি করা হয়েছে।
অর্থাৎ, তাকসিং সেক্টরে ভারতের চ্যালেঞ্জ শুধু সীমান্তরেখার অবস্থান বা চিনা সেনার টহল ঘিরে নয়। ভারতের দিকে সড়ক যোগাযোগের ঘাটতি এবং বিভিন্ন মানচিত্রের অমিলও পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সীমান্তের অবস্থান নিয়ে স্পষ্টতা না থাকা এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর রাস্তা সীমিত হওয়ার কারণে অনুপ্রবেশের নতুন কোনও অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করাও কঠিন। তাই তাকসিংয়ে চিনা সেনার গতিবিধি নিয়ে কোনও দাবি সামনে এলে, সেটি মূল্যায়নের জন্য স্যাটেলাইট ছবি, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সীমান্তের অবস্থান, সবকিছুই খতিয়ে দেখা জরুরি।