দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিজিৎ দীপকেপাঞ্জাবি গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জের প্রতি নিজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা ফের একবার প্রকাশ করলেন ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। দিল্লিতে দিলজিতের সাম্প্রতিক কনসার্টের পর গায়কের সাহস এবং পাঞ্জাবি সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার অবদানের প্রশংসা করেছেন তিনি। পাশাপাশি, গত জুন মাসে দু’জনের মধ্যে তৈরি হওয়া মতবিরোধের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেছেন অভিজিৎ। জানিয়েছেন, প্রতিবাদের সময় দিলজিতের একটি মন্তব্যে তিনি কিছুটা আঘাত পেয়েছিলেন। তবে তাতে গায়কের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বিন্দুমাত্র কমেনি।
দিলজিৎকে উদ্দেশ্য করে একটি পোস্টে অভিজিৎ স্পষ্ট করেছেন, তাঁর মন খারাপের পিছনে কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। বরং তিনি বরাবরই দিলজিৎকে এমন একজন শিল্পী হিসেবে দেখে এসেছেন, যিনি বিভিন্ন ইস্যুতে সরব হন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান।
অভিজিৎ লিখেছেন, 'পাজি, জুন মাসে যখন আমরা প্রতিবাদ করছিলাম, তখন আপনার মন্তব্যে আমি কিছুটা কষ্ট পেয়েছিলাম। আপনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনও ক্ষোভ ছিল না। কারণ আমি সবসময় আপনাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখেছি, যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদে সরব হন।'
এরপর দিলজিতের প্রতি নিজের অনুরাগের কথা জানিয়ে অভিজিৎ জানান, তিনি গায়কের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত। গত মে মাসে ভারতে ফেরার ঠিক আগে শিকাগোতে দিলজিতের কনসার্টেও উপস্থিত ছিলেন অভিজিৎ। শুধু গান শোনার জন্য নয়, দিলজিৎ মানুষ হিসেবে যে পরিচয় তৈরি করেছেন, তার প্রতিও শ্রদ্ধা থেকেই তিনি সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।
অভিজিতের কথায়, 'আপনার সাহস, আপনার সততা এবং নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেও যেভাবে আপনি ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন, তা আমি সবসময় শ্রদ্ধা করি।' তিনি আরও জানান, দিলজিতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অত্যন্ত বেশি, সে কারণেই গায়কের মন্তব্যে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। তবে একটি মতবিরোধ বা ভুল বোঝাবুঝি কখনওই তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বদলে দিতে পারে না।
পোস্টের শেষে অভিজিৎ লেখেন, 'বাকি পাজি, ছোট ভাই মনে করে মাফ করে দিন।' অর্থাৎ, তাঁকে ছোট ভাইয়ের মতো ভেবে বিষয়টি ভুলে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। দিলজিতেরই একটি গানের লাইন দিয়ে পোস্ট শেষ করেন অভিজিৎ। লেখেনস 'গবরু তা বৈরী নু ভি মিঠা বোলদা, নি তু তা ফের জাট দা প্যায়ার গোরিয়ে।'
কেন দিলজিতের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক?
গত জুন মাসে NEET-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে নেমেছিল ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। সেই আন্দোলন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। ইনস্টাগ্রাম লাইভে এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেন, তিনি ওই প্রতিবাদে যোগ দেবেন কি না। উত্তরে দিলজিৎ জানান, তিনি একজন শিল্পী, রাজনীতিবিদ নন।
গায়ক বলেন, 'আমাকে এসবের মধ্যে রাখবেন না। ভাই, আমি একজন শিল্পী। আমি কোনও রাজনীতিবিদ নই। আপনারা আমাকে কী মনে করেন, তা আমি জানি না।'
এরপর গুরু গ্রন্থ সাহিবের একটি পঙ্ক্তিও উদ্ধৃত করেন তিনি। লেখেন, 'নানক দুখিয়া সব সংসার, সো সুখিয়া জিস নাম আধারা।' এই পঙ্ক্তির অর্থ, গোটা পৃথিবীর মানুষই কোনও না কোনও দুঃখের মধ্যে রয়েছেন। ঈশ্বরের নামের আশ্রয় যাঁরা নেন, তাঁরাই শান্তি খুঁজে পান। দিলজিৎ আরও বলেন, 'দেখুন, এই পৃথিবীতে সবকিছু কখনওই ঠিক হতে পারে না। যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, তাঁদেরও অভিনন্দন। যাঁদের জন্য প্রতিবাদ হচ্ছে, তাঁদেরও অভিনন্দন। কারণ এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।'
তাঁর এই মন্তব্যের পরেই সমালোচনার মুখে পড়েন গায়ক। অনেকেই আশা করেছিলেন, আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াবেন তিনি। বিশেষ করে ২০২০ সালের কৃষক আন্দোলনের সময় দিলজিতের ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। সেই সময় কেন্দ্রের ৩ কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি।
এই নিয়ে এ বার দিল্লির কনসার্টে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন দিলজিৎ। শুক্রবার দিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে নিজের ৭ শহরের ‘অরা ইন্ডিয়া ট্যুর’-এর প্রথম অনুষ্ঠান করেন দিলজিৎ। সেখানেই ফের এই বিতর্ক নিয়ে মুখ খোলেন গায়ক। নিজের অবস্থানের পক্ষে সওয়াল করে তিনি বলেন, 'কোনও ইস্যুতে লড়াই করতে পাঞ্জাবিদের কী করতে হবে, তা অন্য কারও শেখানোর প্রয়োজন নেই। পাঞ্জাবিদের লড়াই করতে শেখাবেন না।'
মানবাধিকার কর্মী জসওয়ন্ত সিং খালরাকে নিয়ে তৈরি তাঁর ছবির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। দিলজিতের কথায়, ওই ছবি তৈরি করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করতে হয়েছে তাঁদের সম্প্রদায়কে। গায়ক আরও জানান, তিনি চুপ থাকতে এবং ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতেই বেশি পছন্দ করেন। যাঁরা তাঁকে অপছন্দ করেন, তাঁদের প্রতিও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। যন্তর মন্তরে আন্দোলনের সময় পুলিশের পদক্ষেপের প্রসঙ্গেও কথা বলেন দিলজিৎ। তাঁর মতে, যা ঘটেছিল তা ভুল। ছাত্রছাত্রীদের দাবিদাওয়া নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ করা উচিত।
শুক্রবার দিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে দিলজিতের সাত শহরের ‘অরা ইন্ডিয়া ট্যুর’। অনুষ্ঠানে গায়কের জনপ্রিয় পঞ্জাবি গান, লেজার শো এবং ড্রোন শো ছিল অন্যতম আকর্ষণ। তবে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনুষ্ঠান শুরু হতে বেশ দেরি হয়। বৃষ্টি এবং আয়োজন সংক্রান্ত সমস্যার কারণে এই বিলম্ব বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি, স্টেডিয়ামে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় রিস্টব্যান্ড পেতে দেরি হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বহু দর্শককে।
অনুষ্ঠানের শেষে বিশেষ ভিজ্যুয়াল প্রদর্শনীতে ফুটে ওঠে ‘আই অ্যাম অ্যান আর্টিস্ট, ব্রো’ কথাটি। বিতর্কের সময় দিলজিতের বলা সেই মন্তব্যকেই যেন ফের মনে করিয়ে দেয় এই বার্তা। অন্য একটি প্রদর্শনীতে দেখা যায় ‘ম্যায় হুঁ পঞ্জাব’ কথাটি। নিজের পাঞ্জাবি পরিচয় এবং শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের বার্তাই যেন আরও একবার তুলে ধরেন গায়ক।