চিনে ৪ দিনের সফরে তারেকফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর শুরু করেছেন তারেক রহমান। বর্তমানে চিনে রয়েছেন তারেক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে চিনে। তারেক রহমান মালয়েশিয়া থেকে চিনে এসেছেন। মনে করা হচ্ছে, এই সফর ঢাকা ও বেজিংয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করবে এবং এই সফরকালে বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চিনকে বেছে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, তিনি তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভারতকে বেছে নেননি, যদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা ভারত থেকেই তাঁদের বিদেশ সফর শুরু করে থাকেন।
চিন ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে
তারেক রহমানের সফরের ফলে চিন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিদেশ সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এই সফরকালে বাংলাদেশ ও চিন ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা করছে। তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী ২৬ জুন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।
বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, তারেক রহমান তার এই সফরকালে চিনের কাছ থেকে অর্থিক সাহায্য চাইবেন। রয়টার্সের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকা সম্প্রতি চিনের সাহায্যে চট্টগ্রামে চিনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য ৩৪০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। কর্মকর্তারা এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন, কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চিন তাদের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। তবে, বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যকার এই আঁতাত ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন যে, চিন এই সফরকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ জোরদার করা, বন্ধুত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতাকে অগ্রসর করা, সকল খাতে বিনিময় ও সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা, বহুপাক্ষিক বিষয়ে সমন্বয় বৃদ্ধি করা এবং চিন-বাংলাদেশ সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
ভারতের নজরে তারেকের চিন সফর
২৬ জুন পর্যন্ত তারেকের চিনে থাকার কথা। এই সফরে তিস্তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, ভারত বিষয়টিতে নজরে রাখছে। প্রসঙ্গত, তারেক রহমানের নির্বাচনী বিজয়ের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও, দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা পুরোপুরি দূর হয়নি। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতি এখনও একটি বিবাদের কারণ। এছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে সীমান্তজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানও দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলস্বরূপ, তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চিন সফর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তিস্তা প্রকল্পের ওপর ভারতের বিশেষ মনোযোগ
ভারত তিস্তা প্রকল্পের ব্যাপারে বিশেষভাবে আগ্রহী। তিস্তা ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে অন্যতম, যেগুলোর বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশ এখনো কোনও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন যে, চিনের প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের সেইসব এলাকা পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে যা শিলিগুড়ি করিডোরের (যা চিকেন'স নেক নামেও পরিচিত) কাছাকাছি। এই এলাকাটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার চট্টগ্রামে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের জন্য ৩৪ কোটি ডলারের একটি অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
বাংলাদেশ চিনের সঙ্গে কী কী বিষয়ে আলোচনা করবে?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন সফরকালে বাংলাদেশ ২৪টি চিনা জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা গভীর করার লক্ষ্যে ঢাকা ও বেজিংয়ের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আলোচিত হতে যাওয়া বেশ কয়েকটি চুক্তির মধ্যে এই প্রস্তাবিত চুক্তিটি অন্যতম। বাংলাদেশ অগাাস্টের মধ্যে যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তিটি চূড়ান্ত করার আশা করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা চলতি বছরের অগাস্টের মধ্যে যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তিটি স্বাক্ষর করার আশা করছি।' রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আক্রমণ শাণাতে পারদর্শী এই বিমানগুলি কেনার বিষয়ে বিগত এক বছর ধরে চিনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি দুই দেশের সেনা প্রতিনিধিরা এই বিমান কেনা নিয়ে পরস্পরের দেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত চিনের কাছ থেকে এই যুদ্ধবিমান কিনবে কিনা তার ওপর নির্ভর করবে ভারতের সুরক্ষা কৌশল।
অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব
বাংলাদেশের বিদেশ সচিব বলেছেন, এই সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে, যদিও তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তিনি আরও যোগ করেন যে, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত চারটি প্রধান উদ্যোগকে বাংলাদেশ বিবেচনা করবে এবং স্বাগত জানাবে। তারেক রহমানের এই সফরে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় রয়েছে। তা হল সেদেশের বন্দর শহর মংলায় ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বাগেরহাটের মংলা বন্দর কার্যত পশ্চিমবঙ্গে লাগোয়া। শেখ হাসিনার সময়ে সেখানে ভারতকে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়তে দিতে ১১০ একর জমি দেওয়ার সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তি বাতিল করে ঢাকার বর্তমান নেতৃত্ব চিনকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারেক রহমানের চলতি সফরে এই বিষয়েও চূড়ান্ত কথা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বাংলাদেশ সরকার চিনের কাছ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মার্কিন ঋণ ও অনুদান বাবদ পেতে আগ্রহী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মহম্মদ ইউনূসের পর এবার চিন সফর করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বেজিংয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মাত্রা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারত তারেক রহমানের চিন সফর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই সময়ে তিস্তা পরিকল্পনা সংক্রান্ত কোনও সম্ভাব্য ঘোষণার দিকে ভারত নজর রাখছে। তারেকের এই সফরকে বিশিষ্টি সাংবাদিক তথা বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ সুবীর ভৌমিক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কৌশলগত চাল বলেই মনে করছেন। কারণ ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও চিকেন নেকের জন্য বাংলাদেশে চিনের আধিপত্য বৃদ্ধি আশঙ্কার কারণ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ও বন্ধুত্বের বার্তা দেওয়াই ভারতের পথ হওয়া উচিত।