বাংলাদেশ হাম মহামারি - রয়টার্সবাংলাদেশে মহামারির আকার নিয়েছে হাম। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং টিকাকরণের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাকরণের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ কীভাবে ভয়াবহ আকার নিতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তারই সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশে হাম আক্রান্ত বেড়েই চলেছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাকরণ কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। এরপর মার্চের মাঝামাঝি হাম আউটব্রেক শুরু হওয়ার পর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে প্রায় ২ লক্ষ ২ হাজার আক্রান্তের খবর পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২২ হাজার জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম 'প্রথম আলো'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর অর্থাত্ রবিবার সকাল থেকে ১৯ অক্টোবর অর্থাত্ সোমবার সকাল পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে হাম আক্রান্ত হয়ে। গত মার্চ থেকে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে, এখনও পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০১ জনের মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে। গোটা দেশে আরও ১ হাজার ৩০৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৫১।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে জানান, হামের এই সংক্রমণ ও মহামারি থামাতে সেপ্টেম্বরেই যা দরকার, সব করেছে সরকার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে জিয়াউদ্দিনের দাবিকে একাত্ম করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই গিয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সিলেটে
বাংলাদেশে হাম সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি আক্রন্তের সংখ্যা সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। সরকারি ডেটা বলছে, শুধু সেপ্টেম্বরেই ১৮০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছএ হাম আক্রান্ত হয়ে। পরিবারগুলির অভিযোগ, টিকা দেওয়ার কোনও উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না সরকারের পক্ষ থেকে। সিলেটের ৬টি পরিবারের দাবি, ১ শিশুর মৃত্যুর পরে স্বাস্থ্য দফতরের লোকেরা টিকা দিতে এসেছিলেন। মৃত শিশুর মা রেজিয়া বেগমের কথায়, 'আমার ছেলেটার যখন হাম হল, তার কয়েক সপ্তাহ আগে টিকা দিতে এসেছিল। ছেলের যখন ৯ মাস বয়স ছিল, তখন কেউ আসেনি। আমরা ভাবতে পারিনি, হাম এত বিপজ্জনক।'
বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ছাতক উপজেলায় টিকা না পেয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ন’মাসের শিশু লাবিবা আখতারের। তার বাবা, ৩০ বছরের পেশায় কাঠমিস্ত্রি হুমায়ন রশিদ জানান, গত জুনে মেয়ের মৃত্যু হয়। অথচ এপ্রিল মাসে জরুরি টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় লাবিবার টিকা নেওয়ার সুযোগ ছিল। সেই কর্মসূচিতে হামের টিকা নেওয়ার ন্যূনতম বয়স ন’মাস থেকে কমিয়ে ছ’মাস করা হয়েছিল। মেয়েকে হারিয়ে হুমায়ানের বক্তব্য, 'আমরা লেখাপড়া জানি না। এই টিকা কীসের জন্য, তা আমরা বুঝতে পারি না।'
টিকাকরণে অনীহা ও সচেতনতার অভাব
বাংলাদেশে হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকাকরণ নিয়ে অনীহা বাড়ছে। বিশেষত উন্নত দেশগুলিতে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় ছড়াচ্ছে। আমেরিকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যও এই সংশয়কে উস্কে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকা নিয়ে অনীহার চেয়েও বড় সমস্যা হল টিকাকরণের সুযোগের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি। সময়মতো টিকা না পৌঁছনো এবং টিকাকরণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে।