
বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে এক যুবককে দু'বার গণপিটুনি দেওয়ার অভিযোগ উঠল। পুলিশের হাত থেকে উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানেও শেষরক্ষা হল না। অভিযোগ, হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢুকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায় একদল উত্তেজিত মানুষ। পুলিশের বাধা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আপত্তি উপেক্ষা করেই ফের মারধর করা হয় তাঁকে। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত্যু হয় ওই যুবকের।
মৃতের নাম ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। বয়স তিরিশের কোঠায়। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত। ওই অডিওতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের এমন কিছু মন্তব্য রয়েছে যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে বলে অভিযোগ। যা নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়।
দেবহাটা থানার OC এইচ এম শাহীন প্রথম আলো-কে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ পুলিশ খবর পায়, স্থানীয় কয়েকজন এক ব্যক্তিকে আটকে মারধর করছেন। খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে উদ্ধার করে। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। OC এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল হাসপাতালে জড়ো হয়। সেখানে উপস্থিত পুলিশ এবং চিকিৎসকেরা তাঁদের বাধা দিলেও তাঁরা আপত্তি উপেক্ষা করেন।
অভিযোগ, একসময় হাসপাতালের পিছনের একটি দরজা ভেঙে ওই দলটি ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য রোগীদের সামনেই তাঁকে ফের মারধর করা হয়। এরপর তাঁকে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
দ্বিতীয়বার মারধরের পর ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে নিয়ে যাওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। বুধবার রাত ১টা নাগাদ হাসপাতালে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য দেহ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পরেই এই ঘটনার সূত্রপাত। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অডিওতে হজরত মহম্মদ সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। ঘটনার একাধিক ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ওয়াহিদুজ্জামান শামীম মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং তাঁকে ঘিরে ভিড় জমিয়েছেন অনেকে। কয়েকজনকে আবার মোবাইল ফোনে গোটা ঘটনার ভিডিও করছেন। অন্য একটি ভিডিওতে রাতে দেবহাটার প্রশাসনিক সদর এলাকায় একদল মানুষকে মিছিল করতে দেখা যায়। অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে তারা মিছিল করছিলেন। যে হাসপাতালে শামীম চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেখানে যাওয়ার জন্য অন্যদের ডাকতেও জানাতেও শোনা যায় তাঁদের। যদিও কোনও ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি bangla.aajtak.in.
ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের পরিবারের দাবি, ঘটনার আগে থেকেই তাঁর আচরণে পরিবর্তন এসেছিল। তাঁর দাদা আবদুল জলিল দ্য ডেইলি স্টার-কে জানিয়েছেন, ওয়াহিদুজ্জামান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।
জলিলের দাবি, প্রায় এক বছর আগে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি দুষ্কৃতী দলের খপ্পরে পড়েছিলেন ওয়াহিদুজ্জামান। তাঁকে মাদক খাইয়ে অচেতন করে লুটপাট করা হয়েছিল। বাংলাদেশে এই ধরনের দুষ্কৃতী দলকে স্থানীয়ভাবে ‘অজ্ঞান পার্টি’ বলা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই তাঁর আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর দাদা। পরিবারের সদস্যদের আরও দাবি, মঙ্গলবার বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন ওয়াহিদুজ্জামান। অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন হুমকির জেরে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন জলিল।
তাঁর দাদার বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারের লোকজন শামীমকে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় সাকিপুর এলাকায় একদল মানুষ তাঁকে মারধর শুরু করেন। পরে তাঁকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই দ্বিতীয়বার হামলার ঘটনা ঘটে।
OC এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, পরে পুলিশ হাসপাতালের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে শামীমের পরিবারের তরফে এখনও থানায় কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে পুলিশ আধিকারিক জানান, অভিযোগ জমা পড়লে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।