বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সঙ্কটপ্রবল বিদ্যুত্ সঙ্কটে ভুগছে বাংলাদেশ। দেশজুড়ে ব্যাপক লোডশেডিং। কিন্তু বিদ্যুতের সমস্যা মেটাতে ঢাকার স্ববিরোধিতারই ছবি স্পষ্ট। বাংলাদেশকে বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে সামান্য অতিরিক্ত চার্জের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। ভারত এই চার্জ নিতে চায়, তার কারণ সীমান্ত পেরিয়ে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেওয়ার যে প্রক্রিয়াগত খরচ, সেই টুকু মেটাতে। তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ। ভারতের থেকে নাকি বিদ্যুত্ তারা নেবে না। এখন চিন বন্ধু হয়েছে, চিনের থেকে বিদ্যুত্ নিতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু ভারত প্রতি ইউনিটে মাত্র ১ পয়সা চার্জ বাড়াতে চেয়েছে। অথচ চিনের একটি সংস্থার কাছ থেকে বর্জ্য দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য ইউনিটপিছু ২৫ টাকা দিতে রাজি হচ্ছে বাংলাদেশ।
বিএনপি সরকার বিদ্যুতের থেকে বেশি চিন্তিত ঢাকার আবর্জনা নিয়ে
বাংলাদেশের আপত্তির জেরে পরে তা কমিয়ে আধ পয়সাও করে দিতে রাজি হয় ভারত। বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের জন্য গড়ে ইউনিটপিছু প্রায় ১১ টাকা দেয়। সেখানে চিনা প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম হবে ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট, অর্থাৎ অনেক বেশি। কিন্তু ওই বর্ধিত দাম দিয়ে চিনের সংস্থার থেকে বিদ্যুত্ কিনতে রাজি তারেক রহমান সরকার। বর্জ্য থেকে উত্পাদিত চিনের যে বিদ্যুত্ প্রকল্প, তা মাত্র ৪২ মেগাওয়াটের। এতে বিদ্যুতের সঙ্কট মিটবে না। আসলে বিএনপি সরকার বিদ্যুতের থেকে বেশি চিন্তিত ঢাকার আবর্জনা নিয়ে। চিনের সংস্থার প্রস্তাব হল, তারা ঢাকার আবর্জনা থেকেই বিদ্যুত্ উত্পাদন করবে, তাতে ঢাকার বর্জ্য সমস্যার সমাধান হবে।
প্রস্তাবিত চিনা প্রকল্পের বিদ্যুতের ট্যারিফ বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে ইউনিটপিছু প্রায় ১১ টাকা দরে বিদ্যুৎ কিনেছে, তার তুলনায় প্রায় ১২৭ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশি এক টাকার মূল্য ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ০.৭৭ টাকা। পাশাপাশি ঢাকার আমিনবাজারের এই প্রকল্পটি ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের বিকল্পও নয়। আসলে ঢাকা চাইছে বিদ্যুতের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থপনাও কিনতে। যাতে ঢাকার বিপুল পরিমাণ আবর্জনা সমস্যা থেকে রেহাই মেলে।
কেন বাংলাদেশ বেশি দাম দিয়ে চিনা সংস্থার থেকে বিদ্যুত্ কিনতে রাজি?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ডেলি স্টার-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৫ অর্থবর্ষের মধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম ৫.৮২ বাংলাদেশি টাকা থেকে বেড়ে ১১.৭২ টাকা প্রতি ইউনিট হয়েছে। সেখানে ঢাকার আমিনবাজারের ভাগাড় থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রস্তাব চিনের সংস্থা দিয়েছে ঢাকাকে, তা ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট। এখানে একটি বিষয় বুঝতে হবে, আমিনবাজার প্রকল্পের সঙ্গে ভারতের থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ কেনার বিষয়টি এক নয়। প্রস্তাবিত চুক্তি অনুসারে, চিনের সংস্থা আমিনবাজার ভাগাড়ের আবর্জনা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করবে। তাতে ঢাকার আবর্জনা সমস্যাও মিটবে। বাংলাদেশের গ্রামোন্নয়ন ও সমবায়ের প্রতিমন্ত্রী মির শাহ আলমের দাবি, আমিনবাজার প্রকল্পে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে ১৮ মাসের মধ্যেই। আমিনবাজারে উত্পাজিত বিদ্যুত্ বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিডে পৌঁছে যাবে ২০২৮ সালের অগাস্ট, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই।
তবে বিদ্যুতের দাম বেশি নিয়ে তাঁর বক্তব্য, দাম বেশি হলেও পরিবেশগত দিক থেকে লাভজনক এই চুক্তি। তাঁর কথায়, 'ঢাকা ও গোটা বাংলাদেশেই আবর্জনা একটি বড় সমস্যা। এই চুক্তির ফলে আবর্জনার সমস্যা মিটবে।'
বাংলাদেশ ব্যাপক বিদ্যুত্ ঘাটতির কবলে
গ্যাস ও এলএনজি সাপ্লাই কমে যাওয়ায় ব্যাপক বিদ্যুত্ ঘাটতির কবলে বাংলাদেশ। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে মানুষের বাড়ি, সব অন্ধকার থাকছে বেশির ভাগ দিনই। বাংলাদেশে বিদ্যুতের জন্য ১ বিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস প্রতিদিন লাগে। সেখানে সাপ্লাই কমে তা হয়ে গিয়েছে ৭০০ মিলিয়ন কিউবির ফিট। যার ফলে দেশের একটি বড় অংশই লোডশেডিং ঝেলছে। এক একটি জায়গায় তো দিনে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। ফলে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধছে। রাস্তায় নেমে বিক্ষোভও চলছে। সাপ্লাই কমে আসার সঙ্গে চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। কিন্তু আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহও কমে যাওয়ায় সঙ্কট আর শুধু সরকারি দফতরের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা ক্রমশ সাধারণ মানুষের জীবনেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চিন যতই আবর্জনা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিক, বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুত্ সরবরাহ করে ভারতই। একাধিক চুক্তিতে ভারত থেকে ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ বর্তমানে কেনে বাংলাদেশ। আসলে চিনা প্রকল্পে ঢাকার আবর্জনার সমস্যা মেটানো বাংলাদেশ সরকারের মূল উদ্দেশ্য। না হলে ৪২ মেগাওয়াট ও ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াটের মধ্যে কোনও তুলনাই হয় না।