
বাংলাদেশের হিন্দুরা কেমন কাটালেন দুর্গাপুজো?
আমাদের রাজ্যের মতোই বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিদের কাছে দুর্গাপুজো সবচেয়ে বড় উৎসব। পুজোর কটা দিন আনন্দে মেতে থাকেন সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুরা। এবার বাংলাদেশের পুজোর বেশকিছু রিলও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। একটি ভিডিওয় দেখা যাচ্ছে, ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোড ধরে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রাটি এগিয়ে যাচ্ছিল। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরা মহিলাদের এক বিশাল জনতা রাস্তা জুড়ে নেচে নেচে চলছিল। এই ভাইরাল ভিডিওটি দেখে যে কেউ হয়তো ভেবে বসতে পারতেন যে এটি কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনও অঞ্চলের দৃশ্য, যেখানে দুর্গাপুজো একাধারে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সেইসঙ্গে প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসবও।
কিন্তু এটা ছিল বাংলাদেশের ভিডিও
বাংলাদেশের অনেক হিন্দুর কাছে আনন্দের এই নির্ভীক প্রকাশ কেবল উদযাপন ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্গাপুজো প্রায়শই আতঙ্কের আবহে উদযাপিত হয়েছে। পরিবার, মন্দির ও পাড়া-মহল্লায় হামলার ভয় এই পুজোর এক অনাকাঙ্ক্ষিত অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, এ বছর পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দুর্গাপুজো উদযাপনে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সংখ্যালঘুরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকারকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন।
কী বলছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী?
১৬ অক্টোবর উৎসবের শুরুতে তারেক রহমান প্রকাশ্যে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, 'ধর্ম ব্যক্তিগত, কিন্তু রাষ্ট্র সবার... সবার নিরাপত্তার অধিকার আছে।' এই বার্তাটির সমর্থনে অত্যন্ত ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়েছিল। প্রায় ৩৩,৮৬১টি পুজো রক্ষার জন্য সরকার দেশজুড়ে ৬,০০০ নিরাপত্তা কর্মী, ৫৫০টি পিকআপ ভ্যান এবং ৪৫০টি মোটরসাইকেল মোতায়েন করেছিল। শুধু ঢাকাতেই, মহানগর সর্বজনীন পুজো উদযাপন কমিটির আয়োজিত প্যান্ডেলসহ ২৫৭টি পুজোস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মেট্রোপলিটন পুলিশ ২,১০০ জন কর্মী মোতায়েন করে। ভয়ের মধ্যে পুজো উদযাপনে অভ্যস্ত একটি সম্প্রদায়ের জন্য এই ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির চত্বরে পুজোর আয়োজক সংস্থা মহানগর সর্বজনীন পুজো উদযাপন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস কুমার বিশ্বাস বলেন, 'গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে দুর্গাপুজো উদযাপনের সঙ্গে হিংসার ভয় একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এ বছর সরকারের আয়োজন চমৎকার ছিল।' ২০ অক্টোবর পুজো মণ্ডপে তারেক রহমানের সফরটিও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি ছিল তাঁর প্রথম দুর্গাপুজো এবং বহুলাংশে সংখ্যালঘু সুরক্ষায় তাঁর সরকারের অঙ্গীকারের একটি প্রাথমিক পরীক্ষা। প্রধানমন্ত্রী দেশজুড়ে আরও কয়েকটি পুজো মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মহানগর পুজোয় উপস্থিত ছিলেন।

গোটা পরিস্থিতি
এই পরিবর্তন শুধু পুলিশি ব্যবস্থাতেই নয়, বরং উৎসবের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রতিফলিত হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে হিন্দু সংগঠনগুলো দুর্গাপুজোর ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছিল, যাতে তাঁরা কাজের কোনও বাধা ছাড়াই উৎসবে পুরোপুরি অংশগ্রহণ করতে পারেন। শুভাশিস কুমার বিশ্বাস বলেন, 'আমরা বরাবরই পুজোর সময় আরও দীর্ঘ ছুটির দাবি করে আসছি। অন্তর্বর্তী সরকার ছুটি একদিন বাড়িয়েছিল এবং নতুন সরকার আরও একদিন যোগ করেছে। এইভাবে, তিন দিনের সরকারি ছুটি হচ্ছে। সপ্তাহান্ত সহ আমরা পাঁচ দিন ছুটি পাচ্ছি।' তাঁর মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে আগামী বছর থেকে তিন দিনের সরকারি ছুটি অব্যাহত থাকবে। প্রস্তুতির সরাসরি তদারকির দায়িত্বও শীর্ষ সরকারি নেতাদের দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার কী বলছে?
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, প্রধানমন্ত্রী উৎসব চলাকালীন নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য মন্ত্রী ও সাংসদদের দায়িত্ব দেন এবং ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকটি উপাসনালয়ও পরিদর্শন করেন। টুকু বলেন, 'আমি আমার জেলা সিরাজগঞ্জের দায়িত্বে ছিলাম।' বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী এবং দেশজুড়ে দুর্গাপুজো উদযাপনের তত্ত্বাবধানকারী প্রধান সংগঠন পুজো উদযাপন সমিতির সিরাজগঞ্জ শাখার উপদেষ্টা সত্যনারায়ণ সারদা বলেন, টুকুর স্ত্রী ও প্রাক্তন সাংসদ রুমানা মাহমুদ জেলার বেশ কয়েকটি প্যান্ডেল পরিদর্শন করেন। সারদা আরো জানান, 'সরকার পুজো কমিটিগুলোকে দেওয়া আর্থিক সহায়তাও বাড়িয়েছে। সমাজের দুষ্কৃতকারীরা বরাবরই শান্তিপূর্ণ পুজো উদযাপনে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু সরকার নিশ্চিত করেছে যে এবার তারা কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারবে না। আমাদের পুজোগুলোতে আগে এই ধরনের নিরাপত্তা ছিল না।'
যখন পরিস্থিতি খারাপ হল
তবে উৎসব অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল না। ১৮ অক্টোবর, গাজিপুরের কোনাবাড়ি এলাকার আমবাগানে অবস্থিত শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভেতরে কোরানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফ আলীকে আটক করে। রিপোর্ট অনুসারে, তিনি তার আট থেকে দশ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন এবং প্রতিমাগুলোর সামনে বইটি পুড়িয়ে দেন। মন্দিরের নিরাপত্তা কর্মী ও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নিভিয়ে ফেলে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই ব্যক্তি ও তাঁর ছেলেকে আটক করে। এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে, সংবেদনশীল ধর্মীয় বিষয় কত দ্রুত একটি বড় সঙ্কটে পরিণত হতে পারে। এটি এও প্রমাণ করে যে, সময়োচিত পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ হওয়া থেকে আটকাতে পারে। নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং এটিকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হন। এর ফলে পুজোটি নির্বিঘ্নে চলতে পারে। অনেক হিন্দুর কাছে এই পার্থক্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। বড় ধরনের হিংসার অনুপস্থিতির অর্থ এই নয় যে হুমকিও অনুপস্থিত ছিল। এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর হওয়ারও লক্ষণ হতে পারে।
কুমিল্লায় হিংসার ছায়া
এই স্বস্তির অনুভূতি অতীতের ঘটনার স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২১ সালের অক্টোবরের হিংসার যন্ত্রণা আজও বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের দুর্গাপুজোর অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। সেই বছরের ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পার এলাকার একটি অস্থায়ী দুর্গাপুজো প্যান্ডেলে কোরানের একটি কপি পাওয়া যায়। যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত গুজব ছড়িয়ে পড়ে। জনতা প্যান্ডেলটিতে হামলা চালায় এবং শীঘ্রই চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও রংপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। মন্দির ও মূর্তি ভাঙচুর করা হয়েছিল। হিন্দুদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন রিপোর্ট অনুযায়ী, এতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ মোতায়েন করে, কিন্তু এতে নতুন করে জনবিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত পুলিশ মূল মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেনি, যা ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। পরের বছর দুর্গপুজোর আগে কুমিল্লায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। পুজোমণ্ডপগুলোতে দিনরাত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং টহল বাড়ানো হয়েছিল। যে উৎসবটি ভক্তি ও আনন্দের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, তা নজরদারি ও ভয়ের আবহে উদযাপিত হচ্ছিল।
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়
কুমিল্লার ঘটনায় উদ্বেগ শেষ হয়নি। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হিন্দুদের বাড়ি, দোকান ও মন্দিরে হামলা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ পুলিশ দুর্গাপুজো সম্পর্কিত ৪৯টি ঘটনার কথা জানায়, যার মধ্যে ১৫টি মামলা দায়ের করা হয় এবং ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে এই সমস্যাটি শুধু উৎসবের দিনগুলিতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সাল থেকে সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হামলা শুরু হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ডিসেম্বরে ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার মাধ্যমে। খবরে বলা হয়, তাঁর মরদেহ একটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর কিছুদিন পর শরীয়তপুরে হিন্দু ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে ছুরিকাঘাত করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
এরকম আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং শুভাশিস বিশ্বাসের মতে, এসবের অনেক ক্ষেত্রেই এখনো জবাব মেলেনি। তিনি বলেন, 'আমরা ন্যায়বিচার চাই। এবং আমরা আশা করি যে একদিন আমাদের উৎসব উদযাপনের জন্য আর কড়া নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে না।' তাঁর কথায় এ বছরের দুর্গাপুজোর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই প্রতিফলিত হয়েছে। সরকার ব্যাপক হিংসা ছাড়াই উৎসবটি আয়োজন করতে সফল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য নিরাপত্তাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। এটি একটি বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত, যেখানে উদযাপনের জন্য সশস্ত্র নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে না এবং মানুষ নির্ভয়ে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে।